টানা বর্ষণ ও ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অবৈধ ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগ মিলিয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার খোয়াই নদী তীরবর্তী জনপদ। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রাত প্রায় ৯টার দিকে সদর উপজেলার চরহামুয়া-কালীগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর ডান তীররক্ষা বাঁধের একটি বড় অংশ ভেঙে গেলে মুহূর্তেই নদীর পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। এতে অন্তত ১৫ থেকে ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয় এবং লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন।
বাঁধ ভাঙার পর চরহামুয়া, কালীগঞ্জ, লস্করপুর, পইল, তেঘরিয়াসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় দ্রুত পানি ছড়িয়ে পড়ে। তলিয়ে যায় অসংখ্য বসতবাড়ি, ফসলি জমি, মাছের ঘের ও গ্রামীণ সড়ক। রাতের আঁধারেই শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের নিয়ে হাজারো পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘরবাড়ি ছেড়ে উঁচু স্থানে সরে যায়। অনেকেই আশ্রয় নেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন ও আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সদর উপজেলার আলাপুর-কালীগঞ্জ অংশে বছরের পর বছর ধরে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে বালু উত্তোলন করা হয়েছে। সম্প্রতি আরও কয়েকটি শক্তিশালী ড্রেজার বসিয়ে গভীরভাবে বালু উত্তোলন শুরু করে একটি প্রভাবশালী চক্র। এতে নদীর তলদেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি তীররক্ষা বাঁধের ভিত্তি মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্রোতের চাপ সেই দুর্বল অংশে পড়ায় শেষ পর্যন্ত বাঁধ ধসে যায় বলে দাবি স্থানীয়দের।
১০ নম্বর লস্করপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান উজ্জ্বল মিয়া বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে নিয়মবহির্ভূতভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণেই নদীর তীররক্ষা বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রবল স্রোতের চাপ সহ্য করতে না পেরে বাঁধটি ভেঙে গেছে। অবিলম্বে খোয়াই নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন স্থায়ীভাবে বন্ধ না করলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটবে।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত ও মৌখিকভাবে জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং প্রতিবাদকারীদের বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। তাদের দাবি, প্রশাসনের নজরদারির অভাবেই প্রভাবশালী একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চালিয়ে এসেছে।
বাঁধ ভাঙার খবর পেয়ে হবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ আলহাজ জি কে গউছ, জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শনকালে হুইপ জি কে গউছ বলেন, “অবৈধ বালু ব্যবসার সঙ্গে যারা জড়িত, তারা যে দলেরই হোক না কেন, তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ দ্রুত সংস্কার করতে হবে এবং দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে।” তিনি জেলা প্রশাসনকে জরুরি ভিত্তিতে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত, বাঁধ সংস্কার এবং অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
এদিকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, খোয়াই নদীর পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও জেলার অন্য কয়েকটি নদীর পানি এখনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুক্রবার (১০ জুলাই) সকাল ৯টার তথ্য অনুযায়ী, চুনারুঘাটের বাল্লা পয়েন্টে খোয়াই নদীর পানি বিপদসীমার ৬৩ সেন্টিমিটার ওপরে থাকলেও পানি কমছে। তবে আজমিরীগঞ্জে কালনী-কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার ৭৭ সেন্টিমিটার ওপরে এবং শায়েস্তাগঞ্জ-লাখাইয়ের সুতাং নদীর পানি বিপদসীমার ৬৩ সেন্টিমিটার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে এবং পানি বাড়ছে।
পাউবো আরও জানিয়েছে, হবিগঞ্জ সদর উপজেলার ১০ নম্বর লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় এবং বানিয়াচং উপজেলার ১১ নম্বর মক্রমপুর ইউনিয়নের রাঘপুর এলাকায় খোয়াই নদীর ডান তীরে নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলো সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে।
দুর্গত এলাকাবাসীর দাবি, শুধু জরুরি ভিত্তিতে বাঁধ মেরামত করলেই হবে না; খোয়াই নদীতে অবৈধ ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন স্থায়ীভাবে বন্ধ, দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা, নদী ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য দ্রুত ত্রাণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের আশঙ্কা, কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে খোয়াই নদী তীরবর্তী আরও বিস্তীর্ণ এলাকা একই ধরনের ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

আপনার মতামত লিখুন :