মুসলিম আইন অনুযায়ী পুরুষের জন্য দ্বিতীয় বিয়ে আইনত বৈধ হলেও বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও সামাজিক বাস্তবতায় এতদিন বিষয়টি অপরাধ ও নৈতিকতার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল। এবার স্ত্রী বা প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়াই দ্বিতীয় বিয়ের পক্ষে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
মুসলিম পারিবারিক আইন সংক্রান্ত একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট জানান, দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে স্ত্রীর অনুমতি নয়; বরং আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতির ভিত্তিতেই বিষয়টি নিষ্পত্তি হবে। আদালতের মতে, মুসলিম পারিবারিক আইনে সরাসরি এমন কোনো বিধান নেই, যেখানে দ্বিতীয় বিয়ের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতিকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
২৪ পাতার পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতির ক্ষমতা আরবিট্রেশন কাউন্সিলের ওপর ন্যস্ত। ফলে স্ত্রীর অনুমতি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। এতদিন প্রচলিত ধারণা ছিল—স্ত্রী বা প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা যাবে না। তবে আদালত স্পষ্ট করে জানান, এ বিষয়ে মুসলিম পারিবারিক আইনে সরাসরি কোনো বাধ্যবাধকতার অস্তিত্ব নেই।
রায়ে আইনগত পটভূমিও ব্যাখ্যা করা হয়। ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারায় স্ত্রী বা স্বামীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান ছিল। পরে ১৯৬১ সালে মুসলিম পারিবারিক আইন চালু হলে নারীর ক্ষেত্রে ওই সাজা বহাল থাকলেও পুরুষের দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতির আওতায় আনা হয়। সে অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে এক বছর কারাদণ্ড অথবা ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়।
তবে হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে রিটকারীরা আপিলের ঘোষণা দিয়েছেন। তাদের দাবি, আদালতের এ সিদ্ধান্ত বহু বিবাহের ক্ষেত্রে নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করে দিতে পারে। নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য সমান অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তারা এই রিট করেছিলেন বলেও জানান রিটকারীরা।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, আর্থিক সক্ষমতা ও মনস্তাত্ত্বিক প্রলোভন থেকে অনেক পুরুষ একাধিক বিয়ের সুযোগ অপব্যবহার করতে পারেন। এতে সমাজে বৈষম্য ও পারিবারিক অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বিষয়টি সর্বোচ্চ আদালতে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে তারা মত দিয়েছেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বিষয়টি আপিল বিভাগে গেলে তা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দেবে। দ্বিতীয় বিয়ের আইনি কাঠামো, নারীর অধিকার এবং সামাজিক প্রভাব—সবকিছু মিলিয়ে এই রায় বাংলাদেশের পারিবারিক আইন ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন :