দেশের জন‌্য খালেদা জিয়া সুস্থ হওয়া প্রয়োজন: নূরুজ্জামান মামুন

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ নভেম্বর, ২০২৫, ১০:৩২ রাত

বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির চেয়ারপারসন। পারিবারিক নাম খালেদা খানম, ডাক নাম পুতুল। তাঁর জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট অবিভক্ত ভারতের জলপাইগুড়িতে। তাঁর আদিবাড়ি ফেনীর ফুলগাজী উপজেলায়। বাবার নাম ইস্কান্দর মজুমদার এবং মা বেগম তৈয়বা মজুমদার। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে খালেদা জিয়া তৃতীয়।

দিনাজপুরের সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়ার সময় তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন খালেদা জিয়া। ১৯৮১ সালের ৩০ মে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে কিছু সেনা সদস্যের গুলিতে শহীদ হন। ততদিন পর্যন্ত সাধারণ গৃহবধূই ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। শেষ পর্যন্ত দলের নেতাকর্মীদের দাবির প্রেক্ষাপটে ঘরের চৌহদ্দি ডিঙিয়ে নামেন রাজপথে। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি দলের প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণ করেন। ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। ১৯৮৩ সালের ১ এপ্রিল দলের বর্ধিত সভায় প্রথম বক্তৃতা করেন। বিচারপতি সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে বেগম জিয়া দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে পার্টির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। সেই থেকে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

১৯৮৩ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সাত দলীয় ঐক্যজোট গঠিত হয়। একই সময় এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। বেগম জিয়া ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ৭ দলীয় ঐক্যজোটের মাধ্যমে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন শুরু করেন।

১৯৮৬ সালে চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানের এক মঞ্চে বেগম জিয়া ও শেখ হাসিনা এরশাদের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দেন। কিন্তু ঢাকায় ফিরেই শেখ হাসিনা এরশাদের সঙ্গে আতাত করে নির্বাচনে অংশ নেন। আর বেগম জিয়া তার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। যে কারণে তিনি আপসহীন নেত্রীর খেতাবে ভূষিত হন। স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময়ে তাকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিল। ট্রাক চাপা দিয়ে হত্যার চেষ্টাও করা হয়।

খালেদা জিয়ার আপসহীন নেতৃত্বের কারণে বিএনপি মানুষের আস্থা অর্জন করে। ফলে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। ওই বছরই সংসদীয় সরকার পদ্ধতি প্রবর্তন হলে বেগম জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৯৩ সালে তিনি সা‌র্কের চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর এক মাসের জন্য ষষ্ঠ সংসদের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ওই বছরে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হেরে যায় খালেদা জিয়ার দল বিএনপি। তিনি হন প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট নির্বাচনে জয়লাভের পর তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করে।

ওয়ান-ইলেভেনের ঘটনার মাধ্যমে বিএনপিকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সেনা সমর্থিত ফখরুদ্দীন সরকার বেগম খালেদা জিয়াকে কারারুদ্ধ করে। ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তি পান। সেনা সমর্থিত সরকার জিয়া পরিবাররের উপর নির্যাতনের স্টিম রোলার চালায়। তারেক জিয়াকে গ্রেফতার করে নির্যাতন করে। জিয়া-খালেদা দম্পতির দুই সন্তান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোকে সপরিবারে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। ফখরুদ্দিন সরকার বেগম খালেদা জিয়াকে দেশ ছাড়তে চাপ দিলেও রাজি করাতে পারেনি। কোকো ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়াতে মারা যান। তাঁর লাশ গুলশান অফিসে নিয়ে আসলে সন্তান হারানোর শোকে খালেদা জিয়া ভেঙে পড়েন। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তাঁর আহাজারি দেখে আমারও চোখের পানি পড়েছিল।

২০০৮ সালের পাতানো নির্বাচনে বিএনপিকে হারিয়ে দেয়া হয়। বিরোধীদলীয় নেতা হন খালেদা জিয়া। ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করলে বিএনপি সংসদে প্রতিনিধিত্ব হারায়। খালেদা জিয়া ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত চারটি সংসদ নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন জেলার ১৮টি সংসদীয় আসন থেকে নির্বাচন করে সবকটিতেই জয়লাভ করেন।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে আবার জিয়া পরিবারের উপর নির্যাতন শুরু করে। ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে সেনানিবাসের প্রেসিডেন্ট জিয়ার স্মৃতি বিজড়িত বাড়ি থেকে এক কাপড়ে বের করে দেয়া হয়। ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি গুলশানের অফিসে তালা লাগিয়ে দেয় হাসিনা সরকার। বিদ্যুৎ, পানি ও টেলিফোনের লাইন কেটে দেয়। বাড়ির সামনে বালুভর্তি ট্রাক এনে পথ আটকে দেয়া হয়। অবরুদ্ধ করে রাখা হয় বেগম খালেদা জিয়াকে। খাবার পর্যন্ত সরবরাহ করতে দেয়া হয়নি। ওই সময়ে আমি বিএনপি বিট কাভার করতে গিয়ে দেখেছি করুন পরিস্থিতি। পুলিশ মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিক অস্ত্র পেপার স্প্রে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ওপর ছুড়ে। নিষিদ্ধ পেপার স্প্রে করে সরকার বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ ও জাতিসংঘের সনদের লঙ্ঘন করেছে।

২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি গুলশানের কার্যালয়ে খালেদা জিয়ার ওপর পেপার স্প্রে নিক্ষেপের ফলে তাঁর শরীরে এর রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ায় খুব অসুস্থ হন। মূলত সেই থেকে বুকে ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট শুরু হয় বেগম জিয়ার। গুলশান অফিসে ৯২ দিন তাঁকে আটকে রাখা হয়েছিল। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে আওয়ামী লীগের সাজানো জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় পাঁচ বছরের সাজা দেয়া হয়।

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দীন রোডের কারাগারে বন্দি রাখা হয়। বেগম খালেদা জিয়াকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় মাত্র দুই কোটি টাকার সাজানো মামলার ফরমায়েশি রায়ে কারারুদ্ধ করে শেখ হাসিনার সরকার। পুরোনো কারাগারে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে বিনা চিকিৎসায় বন্দী রাখার ফলে বেগম খালেদা জিয়া অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা তাকে বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসার সুপারিশ করলেও বার বার পরিবারের পক্ষ থেকে করা আবেদন শেখ হাসিনার সরকার নাকচ করে দেয়।

দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ হলে, ছয় মাসের জন্য সাজা স্থগিত করে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ বেগম খালেদা জিয়াকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেয় সরকার। এ সময় গুলশানের ভাড়া বাসা ফিরোজায় বন্দী রাখা হয় বেগম খালেদা জিয়াকে। হাসপাতাল ও বাসায় ছাড়া কোথাও যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি তাকে। বেগম খালেদা জিয়া বাসায় কয়েকবার গুরুতর অসুস্থ হলে, কয়েক দফা হাসপাতালে নিয়ে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগ সরকার বেগম জিয়াকে স্থায়ীভাবে বিদেশে চলে যাওয়ার একাধিকবার প্রস্তাব দিলেও তিনি রাজি হননি। তিনি বার বার বলেছেন, ‘বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই। এ দেশকে ছেড়ে, এ দেশের মানুষকে ছেড়ে আমি কোথাও যাবো না।’ দেশি, বিদেশি সব চাপ, জেল, জুলুম, নির্যাতন সহ্য করে দেশেই থেকে গেছেন আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।

পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমন কোনো ঘৃণিত কাজ নেই যা খালেদা জিয়ার সঙ্গে করেনি।

গত বছর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এর পরদিন ৬ আগস্ট খালেদা জিয়ার সাজা মওকুফ করেন রাষ্ট্রপতি।

সরকারের নানা নির্যাতন, সন্তানের শোক, একাকিত্ব জীবনে বিনা চিকিৎসায় ৮১ বছর বয়সী সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শরীরে নানা রোগ বাসা বাধে। তিনি দীর্ঘদিন থেকে লিভার সিরোসিস, কিডনি, হার্ট, ডায়াবেটিস ও আর্থ্রাইটিসসহ নানা শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন। গত ৮ জানুয়ারি উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যের লন্ডনে যান বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। তাঁর শারীরিক অসুস্থতার কথা জেনে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির পাঠানো বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তিনি লন্ডনে যান।

লন্ডন ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক প্যাট্রিক কেনেডি ও অধ্যাপক জেনিফার ক্রসের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন। কাতারের আমিরের দেওয়া এয়ার অ্যাম্বুলেন্সেই দীর্ঘ চার মাস পর যুক্তরাজ্যের লন্ডন থেকে ৬ মে দেশে ফিরেন তিনি। টানা ১৭ দিন ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি ২৫ জানুয়ারি থেকে লন্ডনে ছেলে তারেক রহমানের বাসায় ছিলেন।

আওয়ামী লীগের আমলে গুম, খুন, নির্যাতন, দুর্নীতিসহ অপশাসনের ডুকমেন্টারি তৈরির টিমে কাজ করতে গিয়ে বেগম জিয়াকে খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। আমি দেখেছি তাঁর দেশপ্রেম, জ্ঞানের গভীরতা, সততা, ব্যক্তিত্ব, নেতাকর্মীদের প্রতি ভালোবাসা। তিনি বর্তমানে দেশের একমাত্র ঐক্যের প্রতীক। তাঁর সিদ্ধান্ত দল-মত নির্বিশেষে সবাই মেনে নিত। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটে তাঁর সুস্থ হওয়া জরুরি। বিশ্ব ইতিহাসে গণতান্ত্রিক সংগ্রামে তিনি নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। তাঁর মতো আপসহীন নেত্রী বিশ্বে দ্বিতীয়জন জন্ম নেবে কিনা সন্দেহ আছে।

সর্বশেষ সেনাসদরের অনুষ্ঠানে বেগম জিয়ার চিকিৎসা ও নিরাপত্তা দলের দায়িত্বে বড় ধরনের অবহেলা ছিল। তাঁর চারপাশে এত মানুষকে কাছ থেকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া ঠিক হয়নি। তাঁর চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা ডাক্তার জাহিদ ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে থেকেও কারও মুখে মাস্ক নেই খেয়াল করেননি। অসুস্থ বেগম জিয়ার নিজের মাস্ক নাক ও মুখ থেকে সরা‌নো ছিল। এই ঘটনার ঠিক পরদিনই তাঁর ফুসফুস ও হৃদপিণ্ডে নতুন করে সংক্রমণ ধরা পড়ে।

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বর্তমানে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে সংকটজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁর দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি। তাঁর জীবনের শেষ বাসনা পুত্র তারেক রহমানকে দেশের প্রধানমন্ত্রী দেখে যেতে পারেন সে প্রার্থনা করি।

লেখক: কানাডা প্রবাসী গণমাধ্যম কর্মী।

 

Link copied!