ঠিকানা বিহীন জীবন ওদের বেদে ও মানতা সম্প্রদায়রা

Spread the love

সঞ্জয় ব্যানার্জী, দশমিনা(পটুয়াখালী) প্রতিনিধি ।। “খা…খা…খা…… বখখিলারে খা…! কাঁচা ধইরা খা…! ” গ্রাম-গঞ্জের মেঠো পথ ধরে ভেঁসে আসা চির চেনা সেই সুর রচয়িতা তারা “বেদে”। এই আধুনিক যুগেও জীবন যুদ্ধে জীবিকার সন্ধানে “এই…… সিঙ্গা… লাগাই……, দাঁতের পোক ফালাই…” বেদেনীর বেদনাময়ী জোরালো আবেদন এখন আর কারো মনে নাড়া দেয় না। আগের মতো কেউ আর চাল, ডাল, শাক-সব্জির বিনিময়ে মাছ আনতে নদীর ঘাঁটে যান না। বদল প্রথা নেই আর এ সংসারে। অর্থের প্রবল নেশায় স্থালের মানুষেরা ভাতের সাথে মাছ আর বস্ত্র আছে কিনা খবর রাখেনা কেউ। আসহায় হয়ে পরেছে এসব মাছ ধরা লোকগুলো এরা সামাজের “মানতা”।

 

বেদেরা স্থালে আর মানতাদের নদীতেই সংসার। কেমন আছেন ঠিকানা বিহীন জীবনে এই যাযাবর বেদে ও মানতা সম্প্রদায়রা। নিজ ভূখন্ডে বাস করেও যারা পরবাসী! সমাজ সভ্যতা গড়ার কাজে প্রতিনিয়ত নিবেদিত প্রাণের লোকগুলো কেমন আছে? বিষধর সাপ নিয়ে খেলা, বিষাক্ত জীবন নিয়েই তাদের বসবাস। এক সময় নৌকা নিয়ে নৌ-পথে চলাচল করতো এ সম্প্রদায়রা। এখন নৌ-পথেই বাধ, সুলীজগেট নির্মানের ফলে নৌকা নিয়ে চলাচল একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে বেদেদের। বেদেরা এখন সড়ক পথে এসে পথ থেকে প্রান্তরে জনগুরুত্ব¡পূর্ন হাট-বাজারের সংলগ্নে ছোট-ছোট ঝুপড়ি ঘর তুলে বসবাস করে। সাপ খেলার পাশাপাশি বেদেনীরা তাবিজ-কবজ নিয়ে ঘুরে বেড়ায় গাঁয়ের মেঠো পথে। তবে দিন দিন এ বেদে সম্প্রদায় সাপ ধরার নেশা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। নানান পন্য এখন তাদের হাতে উঠেছে। বেঁচে থাকর নিরান্তর সংগ্রমেই আজ তাদের ভিন্ন পথে চলা বৈকি। তার পরও যারা এ পেশাকে আগলে রেখেছে তাদের জীবন চলছে খুড়িয়ে খুড়িয়ে।

 

তেমনি আশ্রয় নেয়া পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলা বাঁশবাড়িয়ার খাল-গোড়ায় ঠাই নিয়েছে সাইবের হাটএলাকার একটি বেদে বহর। এ বহরে রয়েছে ৩০ টি পরিবার তাদের মোট লোক সংখ্যা দেড়শতাধিক। এ বহরের সর্দার মো.ফরিদ সরদার। কথা হয় সর্দারের সাথে। তিনি বলেন, আমরা যাযাবর, সরকার আসে সরকার যায়, আমাদের মিলছেনা কোন ঠিকানা! আজ এখানে আছি, কাল ওখানে, এইভাবেই চলতে হয় আমাদের। প্রতিটি বেদে বহর এক একটি রাজ্যের মতো কল্পনা করে এরা। সর্দার এদের রাজা। তার নিয়ন্ত্রনে চলতে হয় বহরের সবাইকে। বেদে বহরের মেয়েরাই আয় রোজগার করে। মেয়েরাই সকালে জীবিকার জন্য দল বেধে বের হয়। গ্রাম থেকে গ্রামে ছুটে, সন্ধ্যার দিকে ফিরে আসে বহরে। পুরুষরা সারাদিন বাচ্ছাদের দেখাশুনা করে। সর্দাররা বংশক্রমেই সরদার হয়। সর্দারের দৃষ্টিতে অপরাধ করলে বেদে সমাজে জুতা পেটা, অর্থ দন্ডসহ নানা ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে। সরদার বললেন, সাপ খেলায় এখন আর পেট বাঁেচনা। পুরুষরাও ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে আসতে শুরু করেছে অভাব অনটনের কারনে। কেউ কেউ পুকুর-ডোবায় তলিয়ে যাওয়া সোনা রুপা তুলে দেয়ার কাজ করে।

 

কেউ দিচ্ছে বিভিন্ন রোগের ঝাড়-ফুঁক ও তাবিজ-কবজ। বিক্রি করছে শাড়ী, চুড়িসহ প্রসাধনী। কেউ কেউ ভানুমতির খেলা ও জাদুমন্ত্র নিয়ে হাজির হচ্ছে হাট-বাজারে। বেদে বহরের বয়স্করা জানালেন, বেদের মধ্যে রয়েছে অনেক উপ-সম্প্রদায়। যেমন, মালবৈদ্য, বাজিকর, শালদার, বান্দরওয়ালা, সওদাগার, কুড়িন্দা, হাতলেহেঙ্গা, মিশ্চিয়ারি, গাড়লী। মালবৈদ্যরা প্রধানত সাপ খেলা দেখায় ও দাতেঁর পোকা তোলে। বাজিকরেরা ম্যাজিক দেখায় ও জাদুটোনা করে। শালদার মাছ ধরে, নদী থেকে ঝিনুক তুলে মুক্তা বের করে এবং চুড়ি বিক্রি করে। বান্দরওয়ালা বান্দরের খেলা দেখায়। সওদাগার চুড়ি, শাড়ি-কাপর বিক্রি করে। কুড়িন্দা হাতগোনা ও হাত দেখে ভাগ্য বর্ননা করে। হাতলেহেঙ্গা পুকুর ডোবায় সোনা-রুপা হাড়িয়ে গেলে তুলে দেয়। মিশ্চিয়ারি সিঙ্গা ফুঁেক শরীর থেকে বিষ বের ও বাতের চিকিৎসা করে। গড়ালীদের একমাত্র পেশা সাপ ধরা, সাপের বিষ নামানো, সাপ বিক্রি ও চলচিত্রে সাপ সরবরাহ করা। এ সম্প্রদায়ের সব চাইতে ব্যতিক্রম অনুষ্ঠান বিয়ের অনুষ্ঠান। বিয়ের আসরে বরকে নির্ধারিত গাছের ডালে অথবা ঘরের চালে বসে মৃত্যু ঝুকি নেয়। কনে গাছের নিচে এসে বরকে নামানোর জন্য কাকতি-মিনতি শুরু করে। কনে বরকে আজীবন আয়-রোজগার করে খাওয়াবে বলে একের পর এক প্রতিশ্রুতি দিতে থাকে। তখন বর গাছ বা চাল থেকে নেমে আসে। তবে যৌতুক বিহীন এ বিয়েতে কাজী রেজিষ্টার প্রয়োজন হয় না ।

 

নদীর কলতানে যাদের ঘুম ভাঙ্গা আর ঘুমোতে যাওয়া তেমনি অপর একটি সভ্যতার নিগৃহীত সম্প্রদায় মানতারা। তেঁতুলিয়া-বুড়াগেীরাঙ্গ নদীর বাঁকে খালে ওদের দেখা মেলে। জন্ম থেকে নদীর জলে খেলা করতে করতে ওরা বড় হয়। এরকম একজন জসীম সরদারের স্ত্রী রুনু বেগম (৩৭), ১৫ বছরের স্বামীর সংসারে হাল ধরতে নৌকার হাল ধরতে হয়েছে। কিশোরী বয়সের বিবাহিত জীবন আজ জীর্ণ ছিন্ন, রোগাক্রান্ত শরীর, পুষ্টিহীনতায় ভুগেও রুনু বেগম রেহাই পাচ্ছে না সংসার নামক যন্ত্রনা থেকে। ৬ সদস্যে পরিবারে ৪ সন্তানের জননী আজ। উপজেলার বগীর একই খালের আদম আলী (৩০), ছদু (৩৫)সহ ৩০টি টির অধিক নৌকায় প্রায় পৌনে দু’শতাধিক লোকের বাস। এদের প্রত্যেকের গড়ে ৪/৫টি সন্তান রয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন খালে রয়েছে এরকম প্রায় শতাধিক লোকের বসবাস। জন্ম নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে নেই কোন ধারনা। আর থাকবেইবা কি করে? ওরাতো নদীর জলে বসবাস করে, মাছ ধরে বিক্রি করে, চাল, ডাল কিনে খায়। পুঁজি যোগানোসহ এ সম্প্রদায়ের মানুষের সাহায্য-সহায়তায় নেই সরকারী-বেসরকারী উদ্যোগ। এরা সব ধরনের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। এদের ভোটের রাজনীতি নেই। কে জিতল আর কে হাড়ল সে খবর তারা রাখে না ওরা। অথচ কয়েক’শ বছর ধরে মানতা সম্প্রদায়ের মানুষকে যাযাবর চরিত্র নিয়ে সমাজ-সভ্যতায় এদের অংশ গ্রহণ। মানতা সম্প্রদায় মূলত বরশি ও ছোট ছোট জাল দিয়ে মাছ ধরে।

 

পেটের ক্ষুধা মিটিয়ে সঞ্চিত অর্থের ওপর বরশি, জাল কেনা আর নৌকা মেরামত নির্ভর করে। শিক্ষা কি এরা জানেনা। ভোটাধিকার প্রয়োগে নেই এদের আগ্রহ। এরকম সমাজ সভ্যতার অনেক কিছুই অজানা এই মানুষেরা নদীর কয়েক ফুট উচু ঢেউ কিংবা প্রকৃতিক দূর্যোগের মধ্যে শক্ত হাতে নৌকা চালাতে পারে, নদী আর সাগর জলের আচর-আচরন এদের নখদর্পনে। জলের মতি-গতির সাথে সখ্যতা এদের জন্মাধিকার। এরা দল বেঁধে বহর নিয়ে বঙ্গোপসাগরের গভীর থেকে শুরু করে সুন্দরবন এবং হাতিয়া, সনদ্বীপ, টেকনাফ পর্যন্ত মাছ ধরতে ঘুরে বেড়ায়। জনমানবহীন দ্বীপাঞ্চল সোনারচর, রুপারচর, জাহাজমারা, শীলেরচর, চর-পাতিলায় এদের অনেক সময় দেখা যায়। প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষাও এদের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এরা প্রধানত পোয়া, রামছোস (তাপসী), ট্যাংরা, গলসা, পাঙ্গাশ, কাওন প্রভৃতি মাছ ধরে। মইয়া জাল দিয়ে চিংড়ি মাছ ধরে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে। এ সম্প্রদায় প্রতিটি নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর মাছ ধরায় পারদর্শী। এতসব অবদানের পরেও মানতা সম্প্রদায় আমাদের সমাজের অন্তভূক্ত নয়। নানা সমস্যা-সংকট এদের আষ্টে-পৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে।

 

এরা ভূখন্ডের কয়েশ বছরের পুড়ানো বাসিন্দা হলেও এদের নেই কোন প্রকার নাগরিক অধিকার। নেহাত ভেসে কঁচুড়িপানা কিংবা নদীর জলে যওয়া খড়কুটোর মতোই মানতারা আজীবন নদীর পানিতে ভেঁসে বেড়ায়। নাগরিক পরিচয় সংকট এদের প্রবল। এ সম্প্রদায়ের নাম স্বাক্ষর করতে পারে এ ধরনের মানুষের সংখ্যা খুবই কম। শিশুদের স্কুলে যাওয়ার সুযোগ নেই। এছাড়া স্থায়ীই ঠিকানা না থাকায় এবং ভূমি সমস্যায় এ সম্প্রদায়ের মানুষের মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য। এ সম্প্রদায়ের মানুষের মৃত্যু হলে আগেকার দিনে কলা গাছের ভেলায় লাশ ভাসিয়ে দেয়া হত। আজকের দিনেও নদীর পাড়ে বা কোন ভূস্বামীর পরিত্যাক্ত ভিটের দানকৃত ভূমিতে ঠাঁই মিলে যাযাবর লাশটির।

 

নিউজটি শেয়ার করুন:

সর্বশেষ আপডেট



» ‘ডিম বালক’- এর সহায়তায় ১৯ হাজার ডলার সংগ্রহ

» বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ তসবি তৈরি করলেন বাংলাদেশি তরুণ

» সোনারগাঁয়ে বঙ্গবন্ধুর ৯৯তম জন্ম বাষিকী পালন

» কলাপাড়ায় সন্ত্রাসী হামলায় মা ও মেয়েসহ একই পরিবারের আহত-৪

» জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৯তম জন্মবার্ষিকী পালন

» জাবিতে বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী ও জাতীয় শিশু দিবসে নানা আয়োজন

» গলাচিপায় বঙ্গবন্ধুর জন্ম বার্ষিকী ও জাতীয় শিশু দিবস উদযাপন

» ঝালকাঠিতে বঙ্গবন্ধুর ৯৯তম জন্মবার্ষিকী ও জাতীয় শিশু দিবস পালিত

» ঝালকাঠি বরিশাল আঞ্চলিক মহাসড়ক সংস্কার কাজে অনিয়মের প্রতিবাদে মানববন্ধন

» কালকিনিতে শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৯তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন

লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন

ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মো: আবুল কালাম আজাদ, খোকন
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : কামাল হোসেন খান
সম্পাদক : এডভোকেট মো: ফেরদৌস খান
বার্তা সম্পাদক : মো: সো‌হেল অাহ‌ম্মেদ
সহ-সম্পাদক : নুরুজ্জামান কাফি
মফস্বল বিভাগ প্রধান: উত্তম কুমার হাওলাদার
যোগাযোগ: বাড়ী- ৫০৬/এ, রোড- ৩৫,
মহাখালী, ডি ও এইচ এস, ঢাকা- ১২০৬,
ফোন: +৮৮ ০১৭৩১ ৬০০ ১৯৯, ৯৮৯১৮২৫,
বার্তা এবং বিজ্ঞাপন : + ৮৮ ০১৬৭৪ ৬৩২ ৫০৯।
বিজ্ঞাপন এবং নিউজ : + ৮৮ ০১৭১৬ ৮৯২ ৯৭০।
News: editor.kuakatanews@gmail.com
Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
আজ মঙ্গলবার, ১৯ মার্চ ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ, ৫ই চৈত্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

ঠিকানা বিহীন জীবন ওদের বেদে ও মানতা সম্প্রদায়রা

ইউটিউবে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:
Spread the love

সঞ্জয় ব্যানার্জী, দশমিনা(পটুয়াখালী) প্রতিনিধি ।। “খা…খা…খা…… বখখিলারে খা…! কাঁচা ধইরা খা…! ” গ্রাম-গঞ্জের মেঠো পথ ধরে ভেঁসে আসা চির চেনা সেই সুর রচয়িতা তারা “বেদে”। এই আধুনিক যুগেও জীবন যুদ্ধে জীবিকার সন্ধানে “এই…… সিঙ্গা… লাগাই……, দাঁতের পোক ফালাই…” বেদেনীর বেদনাময়ী জোরালো আবেদন এখন আর কারো মনে নাড়া দেয় না। আগের মতো কেউ আর চাল, ডাল, শাক-সব্জির বিনিময়ে মাছ আনতে নদীর ঘাঁটে যান না। বদল প্রথা নেই আর এ সংসারে। অর্থের প্রবল নেশায় স্থালের মানুষেরা ভাতের সাথে মাছ আর বস্ত্র আছে কিনা খবর রাখেনা কেউ। আসহায় হয়ে পরেছে এসব মাছ ধরা লোকগুলো এরা সামাজের “মানতা”।

 

বেদেরা স্থালে আর মানতাদের নদীতেই সংসার। কেমন আছেন ঠিকানা বিহীন জীবনে এই যাযাবর বেদে ও মানতা সম্প্রদায়রা। নিজ ভূখন্ডে বাস করেও যারা পরবাসী! সমাজ সভ্যতা গড়ার কাজে প্রতিনিয়ত নিবেদিত প্রাণের লোকগুলো কেমন আছে? বিষধর সাপ নিয়ে খেলা, বিষাক্ত জীবন নিয়েই তাদের বসবাস। এক সময় নৌকা নিয়ে নৌ-পথে চলাচল করতো এ সম্প্রদায়রা। এখন নৌ-পথেই বাধ, সুলীজগেট নির্মানের ফলে নৌকা নিয়ে চলাচল একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে বেদেদের। বেদেরা এখন সড়ক পথে এসে পথ থেকে প্রান্তরে জনগুরুত্ব¡পূর্ন হাট-বাজারের সংলগ্নে ছোট-ছোট ঝুপড়ি ঘর তুলে বসবাস করে। সাপ খেলার পাশাপাশি বেদেনীরা তাবিজ-কবজ নিয়ে ঘুরে বেড়ায় গাঁয়ের মেঠো পথে। তবে দিন দিন এ বেদে সম্প্রদায় সাপ ধরার নেশা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। নানান পন্য এখন তাদের হাতে উঠেছে। বেঁচে থাকর নিরান্তর সংগ্রমেই আজ তাদের ভিন্ন পথে চলা বৈকি। তার পরও যারা এ পেশাকে আগলে রেখেছে তাদের জীবন চলছে খুড়িয়ে খুড়িয়ে।

 

তেমনি আশ্রয় নেয়া পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলা বাঁশবাড়িয়ার খাল-গোড়ায় ঠাই নিয়েছে সাইবের হাটএলাকার একটি বেদে বহর। এ বহরে রয়েছে ৩০ টি পরিবার তাদের মোট লোক সংখ্যা দেড়শতাধিক। এ বহরের সর্দার মো.ফরিদ সরদার। কথা হয় সর্দারের সাথে। তিনি বলেন, আমরা যাযাবর, সরকার আসে সরকার যায়, আমাদের মিলছেনা কোন ঠিকানা! আজ এখানে আছি, কাল ওখানে, এইভাবেই চলতে হয় আমাদের। প্রতিটি বেদে বহর এক একটি রাজ্যের মতো কল্পনা করে এরা। সর্দার এদের রাজা। তার নিয়ন্ত্রনে চলতে হয় বহরের সবাইকে। বেদে বহরের মেয়েরাই আয় রোজগার করে। মেয়েরাই সকালে জীবিকার জন্য দল বেধে বের হয়। গ্রাম থেকে গ্রামে ছুটে, সন্ধ্যার দিকে ফিরে আসে বহরে। পুরুষরা সারাদিন বাচ্ছাদের দেখাশুনা করে। সর্দাররা বংশক্রমেই সরদার হয়। সর্দারের দৃষ্টিতে অপরাধ করলে বেদে সমাজে জুতা পেটা, অর্থ দন্ডসহ নানা ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে। সরদার বললেন, সাপ খেলায় এখন আর পেট বাঁেচনা। পুরুষরাও ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে আসতে শুরু করেছে অভাব অনটনের কারনে। কেউ কেউ পুকুর-ডোবায় তলিয়ে যাওয়া সোনা রুপা তুলে দেয়ার কাজ করে।

 

কেউ দিচ্ছে বিভিন্ন রোগের ঝাড়-ফুঁক ও তাবিজ-কবজ। বিক্রি করছে শাড়ী, চুড়িসহ প্রসাধনী। কেউ কেউ ভানুমতির খেলা ও জাদুমন্ত্র নিয়ে হাজির হচ্ছে হাট-বাজারে। বেদে বহরের বয়স্করা জানালেন, বেদের মধ্যে রয়েছে অনেক উপ-সম্প্রদায়। যেমন, মালবৈদ্য, বাজিকর, শালদার, বান্দরওয়ালা, সওদাগার, কুড়িন্দা, হাতলেহেঙ্গা, মিশ্চিয়ারি, গাড়লী। মালবৈদ্যরা প্রধানত সাপ খেলা দেখায় ও দাতেঁর পোকা তোলে। বাজিকরেরা ম্যাজিক দেখায় ও জাদুটোনা করে। শালদার মাছ ধরে, নদী থেকে ঝিনুক তুলে মুক্তা বের করে এবং চুড়ি বিক্রি করে। বান্দরওয়ালা বান্দরের খেলা দেখায়। সওদাগার চুড়ি, শাড়ি-কাপর বিক্রি করে। কুড়িন্দা হাতগোনা ও হাত দেখে ভাগ্য বর্ননা করে। হাতলেহেঙ্গা পুকুর ডোবায় সোনা-রুপা হাড়িয়ে গেলে তুলে দেয়। মিশ্চিয়ারি সিঙ্গা ফুঁেক শরীর থেকে বিষ বের ও বাতের চিকিৎসা করে। গড়ালীদের একমাত্র পেশা সাপ ধরা, সাপের বিষ নামানো, সাপ বিক্রি ও চলচিত্রে সাপ সরবরাহ করা। এ সম্প্রদায়ের সব চাইতে ব্যতিক্রম অনুষ্ঠান বিয়ের অনুষ্ঠান। বিয়ের আসরে বরকে নির্ধারিত গাছের ডালে অথবা ঘরের চালে বসে মৃত্যু ঝুকি নেয়। কনে গাছের নিচে এসে বরকে নামানোর জন্য কাকতি-মিনতি শুরু করে। কনে বরকে আজীবন আয়-রোজগার করে খাওয়াবে বলে একের পর এক প্রতিশ্রুতি দিতে থাকে। তখন বর গাছ বা চাল থেকে নেমে আসে। তবে যৌতুক বিহীন এ বিয়েতে কাজী রেজিষ্টার প্রয়োজন হয় না ।

 

নদীর কলতানে যাদের ঘুম ভাঙ্গা আর ঘুমোতে যাওয়া তেমনি অপর একটি সভ্যতার নিগৃহীত সম্প্রদায় মানতারা। তেঁতুলিয়া-বুড়াগেীরাঙ্গ নদীর বাঁকে খালে ওদের দেখা মেলে। জন্ম থেকে নদীর জলে খেলা করতে করতে ওরা বড় হয়। এরকম একজন জসীম সরদারের স্ত্রী রুনু বেগম (৩৭), ১৫ বছরের স্বামীর সংসারে হাল ধরতে নৌকার হাল ধরতে হয়েছে। কিশোরী বয়সের বিবাহিত জীবন আজ জীর্ণ ছিন্ন, রোগাক্রান্ত শরীর, পুষ্টিহীনতায় ভুগেও রুনু বেগম রেহাই পাচ্ছে না সংসার নামক যন্ত্রনা থেকে। ৬ সদস্যে পরিবারে ৪ সন্তানের জননী আজ। উপজেলার বগীর একই খালের আদম আলী (৩০), ছদু (৩৫)সহ ৩০টি টির অধিক নৌকায় প্রায় পৌনে দু’শতাধিক লোকের বাস। এদের প্রত্যেকের গড়ে ৪/৫টি সন্তান রয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন খালে রয়েছে এরকম প্রায় শতাধিক লোকের বসবাস। জন্ম নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে নেই কোন ধারনা। আর থাকবেইবা কি করে? ওরাতো নদীর জলে বসবাস করে, মাছ ধরে বিক্রি করে, চাল, ডাল কিনে খায়। পুঁজি যোগানোসহ এ সম্প্রদায়ের মানুষের সাহায্য-সহায়তায় নেই সরকারী-বেসরকারী উদ্যোগ। এরা সব ধরনের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। এদের ভোটের রাজনীতি নেই। কে জিতল আর কে হাড়ল সে খবর তারা রাখে না ওরা। অথচ কয়েক’শ বছর ধরে মানতা সম্প্রদায়ের মানুষকে যাযাবর চরিত্র নিয়ে সমাজ-সভ্যতায় এদের অংশ গ্রহণ। মানতা সম্প্রদায় মূলত বরশি ও ছোট ছোট জাল দিয়ে মাছ ধরে।

 

পেটের ক্ষুধা মিটিয়ে সঞ্চিত অর্থের ওপর বরশি, জাল কেনা আর নৌকা মেরামত নির্ভর করে। শিক্ষা কি এরা জানেনা। ভোটাধিকার প্রয়োগে নেই এদের আগ্রহ। এরকম সমাজ সভ্যতার অনেক কিছুই অজানা এই মানুষেরা নদীর কয়েক ফুট উচু ঢেউ কিংবা প্রকৃতিক দূর্যোগের মধ্যে শক্ত হাতে নৌকা চালাতে পারে, নদী আর সাগর জলের আচর-আচরন এদের নখদর্পনে। জলের মতি-গতির সাথে সখ্যতা এদের জন্মাধিকার। এরা দল বেঁধে বহর নিয়ে বঙ্গোপসাগরের গভীর থেকে শুরু করে সুন্দরবন এবং হাতিয়া, সনদ্বীপ, টেকনাফ পর্যন্ত মাছ ধরতে ঘুরে বেড়ায়। জনমানবহীন দ্বীপাঞ্চল সোনারচর, রুপারচর, জাহাজমারা, শীলেরচর, চর-পাতিলায় এদের অনেক সময় দেখা যায়। প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষাও এদের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এরা প্রধানত পোয়া, রামছোস (তাপসী), ট্যাংরা, গলসা, পাঙ্গাশ, কাওন প্রভৃতি মাছ ধরে। মইয়া জাল দিয়ে চিংড়ি মাছ ধরে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে। এ সম্প্রদায় প্রতিটি নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর মাছ ধরায় পারদর্শী। এতসব অবদানের পরেও মানতা সম্প্রদায় আমাদের সমাজের অন্তভূক্ত নয়। নানা সমস্যা-সংকট এদের আষ্টে-পৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে।

 

এরা ভূখন্ডের কয়েশ বছরের পুড়ানো বাসিন্দা হলেও এদের নেই কোন প্রকার নাগরিক অধিকার। নেহাত ভেসে কঁচুড়িপানা কিংবা নদীর জলে যওয়া খড়কুটোর মতোই মানতারা আজীবন নদীর পানিতে ভেঁসে বেড়ায়। নাগরিক পরিচয় সংকট এদের প্রবল। এ সম্প্রদায়ের নাম স্বাক্ষর করতে পারে এ ধরনের মানুষের সংখ্যা খুবই কম। শিশুদের স্কুলে যাওয়ার সুযোগ নেই। এছাড়া স্থায়ীই ঠিকানা না থাকায় এবং ভূমি সমস্যায় এ সম্প্রদায়ের মানুষের মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য। এ সম্প্রদায়ের মানুষের মৃত্যু হলে আগেকার দিনে কলা গাছের ভেলায় লাশ ভাসিয়ে দেয়া হত। আজকের দিনেও নদীর পাড়ে বা কোন ভূস্বামীর পরিত্যাক্ত ভিটের দানকৃত ভূমিতে ঠাঁই মিলে যাযাবর লাশটির।

 

নিউজটি শেয়ার করুন:

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মো: আবুল কালাম আজাদ, খোকন
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : কামাল হোসেন খান
সম্পাদক : এডভোকেট মো: ফেরদৌস খান
বার্তা সম্পাদক : মো: সো‌হেল অাহ‌ম্মেদ
সহ-সম্পাদক : নুরুজ্জামান কাফি
মফস্বল বিভাগ প্রধান: উত্তম কুমার হাওলাদার
যোগাযোগ: বাড়ী- ৫০৬/এ, রোড- ৩৫,
মহাখালী, ডি ও এইচ এস, ঢাকা- ১২০৬,
ফোন: +৮৮ ০১৭৩১ ৬০০ ১৯৯, ৯৮৯১৮২৫,
বার্তা এবং বিজ্ঞাপন : + ৮৮ ০১৬৭৪ ৬৩২ ৫০৯।
বিজ্ঞাপন এবং নিউজ : + ৮৮ ০১৭১৬ ৮৯২ ৯৭০।
News: editor.kuakatanews@gmail.com

© Copyright BY KuakataNews.Com

Design & Developed BY PopularITLimited