গণতন্ত্র মানে শুধু ভোটের অধিকার না, উন্নয়নেরও অধিকার

সাইদুর রহমান:  উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে দেশ। দেশের প্রবৃদ্ধি আজ সাতের কোটা ছাড়িয়ে গেছে । উন্নয়নের প্রবল স্রোতে গণতন্ত্র নির্বাক। গণতন্ত্র আসলে একটা মুখরোচক শব্দ । পৃথিবীর কোথাও জনগণের শাসন নাই। আমরা সবাই কথায় কথায় বলি দেশে গণতন্ত্র নাই। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ব্যর্থ হয়েছে পূর্বের প্রতিটি সরকার ও রাষ্ট্র। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রথম দিকে গণতন্ত্রের সূচনা বাঁশি বাজে। তবে আধুনিক গণতন্ত্রের আবির্ভাব ঘটে আঠার শতকে। পৃথিবীতে গণতান্ত্রিক দেশ ১২২টি। পূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশ ১৯ টি, হাইব্রীড ৫৭ টি, বাকী গুলো নামে গণতান্ত্রিক। আর এই ১৯টি পূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশের তালিকায় নেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর নাম। অথচ ১৯টি দেশের সবকটিই আবার ইউরোপ মহাদেশের। সম্প্রতি ব্রিটিশ সাপ্তাহিক ফরম্যাটের সংবাদপত্র দ্য ইকোনোমিস্ট এর ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) এর বার্ষিক ডেমোক্রেসি সুচক বা গণতন্ত্র সুচক-এর সর্বশেষ সংস্করনে এমনই চিত্র দেখা গেছে। আরও বলা হয়েছে, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪.৫% পূর্ণ গণতন্ত্রের অধীনে বাস করেন। আর ৪৪.৮% মানুষ হাইব্রীড গণতন্ত্রের অধীনে বাস করেন।

 

গণতন্ত্র শব্দটি গ্রীক শব্দ “ডেমোক্রেসিয়া” থেকে উৎপত্তি হয়েছে। গণতন্ত্রের পুঁথিগত সংজ্ঞা হচ্ছে, কোনো জাতি বা রাষ্ট্রের এমন একটি ব্যবস্থা যা প্রত্যেক নাগরিকের নীতি নির্ধারণ বা সরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের সময় সমান ভোট বা অধিকার আছে। আমার পরিভাষায় গণতন্ত্র এমন একটি তন্ত্র যে তন্ত্রে ভোটের পূর্বে সমস্ত অধিকার দেওয়া হয়, নির্বাচিত হওয়ার পর ভোটারদের দেয়া সকল প্রতিশ্রুতি ভুলে যাওয়ার অধিকারও দেওয়া হয় । বাংলাদেশে সংসদীয় বহুদলীয় গণতন্ত্র বিরাজমান। গণতন্ত্রের আইকন হল ভারত। ভারতে গণতন্ত্রের যাঁতা কলে পিষ্ট হয়ে ক্ষুদা আর ঋণের জ্বালায় গত ২০ বছরে ৩ লাখ কৃষক আত্বহত্যা করেছে। যদিও বাংলাদেশে এরকম ঘটনা বিরল। এদেশের গণতন্ত্রকে যে দল গুলো বিবর্ণ ও বিবস্ত্র করেছে তারাও আজ গণতন্ত্রের শুভাকাঙ্খী।

 

বাংলাদেশ বিশ্বের ৮৫ তম গণতান্ত্রিক দেশ। স্বাধীনতা যেমন ত্যাগ ও রক্ত ছাড়া আসেনি, গণতন্ত্রও তেমনি রাজপথ রক্তাক্ত করে এসেছে। দেশ স্বাধীন হলো অনেক যুগ হয়ে গেল কিন্তু গণতন্ত্র আজও অপরিপক্ব ও অবহেলিত। মাঝে মধ্যে আই সি ইউ তে রাখা হয়। ৭৫-এ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বিভিন্ন সামরিক শাসক দেশটাকে চালিয়েছে সামরিক কায়দায়। আশি শতকের প্রথম দিকে সুনামি আঘাত আনে গণতন্ত্রের উপর। সামরিক শাসকরা গণতন্ত্রের কণ্ঠ রোধ করলো। তারা গণতন্ত্রের রক্ত চুষে দেশ চালালেন, সামরিক লেবাসে।

 

১৯৮৩ সালে মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাতিল ও সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বিক্ষোভ করে। স্বৈরশাসকের মদদপুষ্ট পুলিশের গুলিতে জাফর, দিপালী, ডা. মিলন, জয়লালের তাজা রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল । গণতন্ত্রের জন্য সমস্ত শরীরটা ক্যাম্পাস বানিয়ে শহীদ হয়েছিলেন নুর হোসেন। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে আমার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। স্বৈরশাসকের পেটুয়া বাহিনীর নির্মম আঘাতে বার বার আমি রক্তাক্ত হয়েছিলাম। যে আঘাতের চিহ্ন এখনও আমার শরীরে বিভিন্ন অংশে দৃশ্যমান। আর সেই স্বৈরশাসক যখন বলেন দেশে গণতন্ত্র নেই, তখন নিজেকে অপদার্থ বলে মনে হয়। গণতান্ত্রিক ভাবে বলতে হয় দেশে যথেষ্ট উন্নয় হয়েছে। স্বাধীনতার পর দেশের সমস্ত উন্নয় ও প্রাপ্তিকে এক পাল্লায় রাখলে, আর বর্তমানে আওয়ামীলীগ সরকারের ১০ বছরের উন্নয়ন ও প্রাপ্তিকে এক পাল্লায় রাখলে, সময়ের ব্যবধানে হোক আর অর্থের ব্যবধানে হোক আওয়ামীলীগের পাল্লা ভারী হবেই।আওয়ামীলীগ সরকারের আন্তর্জাতিক প্রাপ্তিও অনেক। ৬৮ বছর ধরে পরে থাকা অমীমাংসীত ছিটমহলের বিশ্বময় গ্রহনযোগ্য সমাধান, আন্তর্জাতিক আদালত থেকে সমুদ্রসীমা আদায়।বিশ্ব মড়লদেরকে উপেক্ষা করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ, দেশকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করা, এটাকে আমি বলবো দেশের জনগণের অবদান। যে গণতন্ত্র দেশের উন্নয় ও অগ্রগতিকে বিশ্বাস করেনা, সে গণতন্ত্র দিয়ে দেশের সরকার পরিবর্তন ছাড়া কিছুই সম্ভব না।

 

তাহলে কথা বলি গণতন্ত্রের সাথে। ৭৫ এর পর যে সব দল রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিলেন তারা কতটুকু গণতান্ত্রিক ছিলেন? তাঁরা কতটুকু গণতান্ত্রিক ভাবে রাষ্ট্রের মহানায়ক হয়েছেন? তাঁদের দলের উৎপত্তি কি গণতান্ত্রিক ভাবে? সব প্রশ্নের উওর না হবে, বাকীটা ইতিহাস সাক্ষী। দেশে গণতন্ত্র নাই এটা অগণতান্ত্রিক কথা। গণতান্ত্রিক কথা হলো বর্তমানে গণতন্ত্র টাকার মতো অবমূল্যায়ন হচ্ছে না। বিএনপি, জাতীয় পার্টি দেশে গণতন্ত্র নাই বলে গলাবাজি করে। অথচ এই দলগুলোই গণতন্ত্রকে গলা কেটেছে তাঁদের সুবিধার জন্য। আর এই গণতন্ত্রকে জল্লাদদের হাত থেকে রক্ষা করতে রাজপথ রক্তে লাল করেছে এ দেশের জনগণ। কেউ গণতন্ত্রকে হিজড়া বানিয়ে আবার কেউ বন্দুকের নলের ভয় দেখিয়ে গণতন্ত্রের বস্রহরণ করে। স্বৈরশাসকের রক্তচক্ষু আমি দেখেছি, দেখেছি নিষ্ঠুর নির্যাতনের রক্তমাখা শরীর, আমি উপভোগ করেছি নির্মম কারা নির্যাতন। তারই বলেন দেশে গণতন্ত্র নাই!

 

যদিও বিশ্বের কোন রাষ্ট্রই গণতন্ত্রের পূর্ণ দিতে পারেনি। আমি গণতন্ত্রের সঠিক পরিচর্যার পক্ষে। আগে রাজনেতিক দল গুলোর মধ্যে একে অপরের প্রতি আস্হার জায়গা শক্ত করতে হবে। জয়ী হলেই নির্বাচন সুষ্ঠু আর পরাজিত হলেই ভোট ডাকাতি এই সংস্কৃতি থেকে প্রতিটি রাজনেতিক দলকে বেড়িয়ে আসতে হবে। এর জন্য দরকার প্রতিটি দলের মধ্যে প্রকৃত গণতন্ত্র। দেশে বড় দুয়েকটা দল ছাড়া অন্যরা ৪ বছরের জন্য গণতন্ত্রের গ পর্যন্ত ভুলে যান। যখন নির্বাচনের বেশ কয়েক মাস আগে গণতন্ত্রের জন্য মায়া কান্না শুরু করে দেন। গণতন্ত্র একটা চলমান প্রক্রিয়া। জনগণকে গণতন্ত্রের মর্ম বুঝাতে ব্যর্থ হলে, গণতন্ত্রের বারটা বাজবে। তখন অর্থের কাছে বিক্রি হবে কষ্টার্জিত গণতন্ত্র।

 

সামনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তাই যেমন গণতন্ত্রের দরদ বেড়েছে, তেমনি দরদ বেড়েছে দেশের ছোট ছোট রাজনেতিক দলরেও। দলের নিবন্ধন আছে কিংবা নাই, দলের নিজস্ব ভোট ব্যাংক আছে কিংবা নাই এটা চিন্তার বিষয় না। চিন্তার বিষয় হলো জোট করে ক্ষমতার স্বাদ গ্রহন করা। আমাদের দেশে একটা প্রবাদ আছে ” এত লালি আধজের না ” জনবিছিন্ন কোন দল বা ব্যক্তি দিয়ে এক্য হলে, জাতি মতৈক্য ছাড়া আর কিছুই দেখবেনা। গণতন্ত্রে সুফল / কুফল দুটোই আছে। আর গণতন্ত্র মানে শুধু ভোটের অধিকার না, ভাতের ও অধিকার। গণতন্ত্র মানে দেশের সার্বভৌমত্বকে রক্ষার অধিকার। গণতন্ত্র দেশের মানুষের মৌলিক অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করবে । গণতন্ত্রের মানবিক দৃষ্টিকোণ থাকবে অবহেলিত জনগোষ্ঠীর পক্ষে। বর্তমান সরকার একাদশ জাতীর সংসদ নির্বাচনে প্রমাণ করতে হবে, উন্নয়ন ও গণতন্ত্র দুটোই আমার কাছে সমান। দেশে নির্বাচনকালীন সরকার সকল দলের সমন্বয়ে গঠন করতে হবে। দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেওয়া নির্বাচন কমিশনের যেমন নৈতিক দায়িত্ব তেমনি নির্বাচনকালীন সরকারেও।

 

দেশ থেকে আজ অভাব, অনটন, আকাল, সবচেয়ে অশুভ শব্দ মঙ্গা উন্নয়নের ছোঁয়ায় বিতাড়িত হয়েছে। জঙ্গিবাদের মতো কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে, আওয়ামীলীগ সরকার মাথা পিছু ঋণের পরিমান কমিয়ে দেশেকে আজ বিশ্বের মধ্য আয়ের দেশের কাতারে নিয়ে গেছে। আমাদের দেশের অর্থনীতির সূচক ভারত, পাকিস্তানের চেয়েও উপরে। তারপরও যদি আওয়ামীলীগ সরকারকে জনগণ ভোট না দেয়, তাহলে বুঝতে হবে গণতন্ত্র অর্থনীতি বুঝেনা। অন্যদিকে হতে পারে আওয়ামীলীগ তাদের সরকারের উন্নয়নের বার্তা ভোটারদের কাছে পোঁছাতে পারেনি অথবা জনগণের হার্টবিট বুঝতে পারেনি সরকার।

নিউজটি শেয়ার করুন:

সর্বশেষ আপডেট



» মৌলভীবাজারে অতিরিক্ত দাম লিখে বিক্রয় করার অপরাধে মিঠাই বাজারকে জরিমানা

» বেনাপোল পুটখালী সীমান্ত থেকে ৪৫ বোতল ফেন্সিডিল সহ অাটক-১

» আজ অর্ধশত হলে মুক্তি পেল “মিস্টার বাংলাদেশ”

» বিমানে মদ না পেয়ে আইরিশ নারীর কাণ্ড! ভিডিও

» জাতীয় পার্টি লাঙ্গল প্রতীকেই নির্বাচন করবে: মহাসচিব

» অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সম্পাদকদের সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের বৈঠক

» গনসংযোগ ও মতবিনিময় সভায় মনোনয়ন প্রত্যাশী সোহাগ: তৃণমুল নেতাকর্মিদের প্রত্যাশা পুরণে নিঃস্বার্থ ভাবে কাজ করার অঙ্গীকার

» শার্শার উলাশীতে দূর্বত্তদের বোমা হামলায় যুবলীগ নেতাসহ আহত-৩

» রাজধানীর নয়াপল্টনে পুলিশের উপর হামলার প্রতিবাদে ঝিনাইদহে বিক্ষোভ মিছিল

» ঝিনাইদহের ঘোড়শাল ইউনিয়নে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা অনুষ্ঠিত

লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন

ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মো: আবুল কালাম আজাদ, খোকন
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : কামাল হোসেন খান
সম্পাদক : এডভোকেট মো: ফেরদৌস খান
বার্তা সম্পাদক : মো: সো‌হেল অাহ‌ম্মেদ
মফস্বল বিভাগ প্রধান: উত্তম কুমার হাওলাদার
Email: info@kuakatanews.com
যোগাযোগ: বাড়ী- ৫০৬/এ, রোড- ৩৫,
মহাখালী, ডি ও এইচ এস, ঢাকা- ১২০৬,
ফোন: +৮৮ ০১৭৩১ ৬০০ ১৯৯, ৯৮৯১৮২৫,
বার্তা এবং বিজ্ঞাপন : + ৮৮ ০১৬৭৪ ৬৩২ ৫০৯।
বিজ্ঞাপন এবং নিউজ : + ৮৮ ০১৭১৬ ৮৯২ ৯৭০।
News: editor.kuakatanews@gmail.com
Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
আজ শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দ, ৩রা অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

গণতন্ত্র মানে শুধু ভোটের অধিকার না, উন্নয়নেরও অধিকার

ইউটিউবে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

সাইদুর রহমান:  উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে দেশ। দেশের প্রবৃদ্ধি আজ সাতের কোটা ছাড়িয়ে গেছে । উন্নয়নের প্রবল স্রোতে গণতন্ত্র নির্বাক। গণতন্ত্র আসলে একটা মুখরোচক শব্দ । পৃথিবীর কোথাও জনগণের শাসন নাই। আমরা সবাই কথায় কথায় বলি দেশে গণতন্ত্র নাই। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ব্যর্থ হয়েছে পূর্বের প্রতিটি সরকার ও রাষ্ট্র। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রথম দিকে গণতন্ত্রের সূচনা বাঁশি বাজে। তবে আধুনিক গণতন্ত্রের আবির্ভাব ঘটে আঠার শতকে। পৃথিবীতে গণতান্ত্রিক দেশ ১২২টি। পূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশ ১৯ টি, হাইব্রীড ৫৭ টি, বাকী গুলো নামে গণতান্ত্রিক। আর এই ১৯টি পূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশের তালিকায় নেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর নাম। অথচ ১৯টি দেশের সবকটিই আবার ইউরোপ মহাদেশের। সম্প্রতি ব্রিটিশ সাপ্তাহিক ফরম্যাটের সংবাদপত্র দ্য ইকোনোমিস্ট এর ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) এর বার্ষিক ডেমোক্রেসি সুচক বা গণতন্ত্র সুচক-এর সর্বশেষ সংস্করনে এমনই চিত্র দেখা গেছে। আরও বলা হয়েছে, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪.৫% পূর্ণ গণতন্ত্রের অধীনে বাস করেন। আর ৪৪.৮% মানুষ হাইব্রীড গণতন্ত্রের অধীনে বাস করেন।

 

গণতন্ত্র শব্দটি গ্রীক শব্দ “ডেমোক্রেসিয়া” থেকে উৎপত্তি হয়েছে। গণতন্ত্রের পুঁথিগত সংজ্ঞা হচ্ছে, কোনো জাতি বা রাষ্ট্রের এমন একটি ব্যবস্থা যা প্রত্যেক নাগরিকের নীতি নির্ধারণ বা সরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের সময় সমান ভোট বা অধিকার আছে। আমার পরিভাষায় গণতন্ত্র এমন একটি তন্ত্র যে তন্ত্রে ভোটের পূর্বে সমস্ত অধিকার দেওয়া হয়, নির্বাচিত হওয়ার পর ভোটারদের দেয়া সকল প্রতিশ্রুতি ভুলে যাওয়ার অধিকারও দেওয়া হয় । বাংলাদেশে সংসদীয় বহুদলীয় গণতন্ত্র বিরাজমান। গণতন্ত্রের আইকন হল ভারত। ভারতে গণতন্ত্রের যাঁতা কলে পিষ্ট হয়ে ক্ষুদা আর ঋণের জ্বালায় গত ২০ বছরে ৩ লাখ কৃষক আত্বহত্যা করেছে। যদিও বাংলাদেশে এরকম ঘটনা বিরল। এদেশের গণতন্ত্রকে যে দল গুলো বিবর্ণ ও বিবস্ত্র করেছে তারাও আজ গণতন্ত্রের শুভাকাঙ্খী।

 

বাংলাদেশ বিশ্বের ৮৫ তম গণতান্ত্রিক দেশ। স্বাধীনতা যেমন ত্যাগ ও রক্ত ছাড়া আসেনি, গণতন্ত্রও তেমনি রাজপথ রক্তাক্ত করে এসেছে। দেশ স্বাধীন হলো অনেক যুগ হয়ে গেল কিন্তু গণতন্ত্র আজও অপরিপক্ব ও অবহেলিত। মাঝে মধ্যে আই সি ইউ তে রাখা হয়। ৭৫-এ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বিভিন্ন সামরিক শাসক দেশটাকে চালিয়েছে সামরিক কায়দায়। আশি শতকের প্রথম দিকে সুনামি আঘাত আনে গণতন্ত্রের উপর। সামরিক শাসকরা গণতন্ত্রের কণ্ঠ রোধ করলো। তারা গণতন্ত্রের রক্ত চুষে দেশ চালালেন, সামরিক লেবাসে।

 

১৯৮৩ সালে মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাতিল ও সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বিক্ষোভ করে। স্বৈরশাসকের মদদপুষ্ট পুলিশের গুলিতে জাফর, দিপালী, ডা. মিলন, জয়লালের তাজা রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল । গণতন্ত্রের জন্য সমস্ত শরীরটা ক্যাম্পাস বানিয়ে শহীদ হয়েছিলেন নুর হোসেন। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে আমার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। স্বৈরশাসকের পেটুয়া বাহিনীর নির্মম আঘাতে বার বার আমি রক্তাক্ত হয়েছিলাম। যে আঘাতের চিহ্ন এখনও আমার শরীরে বিভিন্ন অংশে দৃশ্যমান। আর সেই স্বৈরশাসক যখন বলেন দেশে গণতন্ত্র নেই, তখন নিজেকে অপদার্থ বলে মনে হয়। গণতান্ত্রিক ভাবে বলতে হয় দেশে যথেষ্ট উন্নয় হয়েছে। স্বাধীনতার পর দেশের সমস্ত উন্নয় ও প্রাপ্তিকে এক পাল্লায় রাখলে, আর বর্তমানে আওয়ামীলীগ সরকারের ১০ বছরের উন্নয়ন ও প্রাপ্তিকে এক পাল্লায় রাখলে, সময়ের ব্যবধানে হোক আর অর্থের ব্যবধানে হোক আওয়ামীলীগের পাল্লা ভারী হবেই।আওয়ামীলীগ সরকারের আন্তর্জাতিক প্রাপ্তিও অনেক। ৬৮ বছর ধরে পরে থাকা অমীমাংসীত ছিটমহলের বিশ্বময় গ্রহনযোগ্য সমাধান, আন্তর্জাতিক আদালত থেকে সমুদ্রসীমা আদায়।বিশ্ব মড়লদেরকে উপেক্ষা করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ, দেশকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করা, এটাকে আমি বলবো দেশের জনগণের অবদান। যে গণতন্ত্র দেশের উন্নয় ও অগ্রগতিকে বিশ্বাস করেনা, সে গণতন্ত্র দিয়ে দেশের সরকার পরিবর্তন ছাড়া কিছুই সম্ভব না।

 

তাহলে কথা বলি গণতন্ত্রের সাথে। ৭৫ এর পর যে সব দল রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিলেন তারা কতটুকু গণতান্ত্রিক ছিলেন? তাঁরা কতটুকু গণতান্ত্রিক ভাবে রাষ্ট্রের মহানায়ক হয়েছেন? তাঁদের দলের উৎপত্তি কি গণতান্ত্রিক ভাবে? সব প্রশ্নের উওর না হবে, বাকীটা ইতিহাস সাক্ষী। দেশে গণতন্ত্র নাই এটা অগণতান্ত্রিক কথা। গণতান্ত্রিক কথা হলো বর্তমানে গণতন্ত্র টাকার মতো অবমূল্যায়ন হচ্ছে না। বিএনপি, জাতীয় পার্টি দেশে গণতন্ত্র নাই বলে গলাবাজি করে। অথচ এই দলগুলোই গণতন্ত্রকে গলা কেটেছে তাঁদের সুবিধার জন্য। আর এই গণতন্ত্রকে জল্লাদদের হাত থেকে রক্ষা করতে রাজপথ রক্তে লাল করেছে এ দেশের জনগণ। কেউ গণতন্ত্রকে হিজড়া বানিয়ে আবার কেউ বন্দুকের নলের ভয় দেখিয়ে গণতন্ত্রের বস্রহরণ করে। স্বৈরশাসকের রক্তচক্ষু আমি দেখেছি, দেখেছি নিষ্ঠুর নির্যাতনের রক্তমাখা শরীর, আমি উপভোগ করেছি নির্মম কারা নির্যাতন। তারই বলেন দেশে গণতন্ত্র নাই!

 

যদিও বিশ্বের কোন রাষ্ট্রই গণতন্ত্রের পূর্ণ দিতে পারেনি। আমি গণতন্ত্রের সঠিক পরিচর্যার পক্ষে। আগে রাজনেতিক দল গুলোর মধ্যে একে অপরের প্রতি আস্হার জায়গা শক্ত করতে হবে। জয়ী হলেই নির্বাচন সুষ্ঠু আর পরাজিত হলেই ভোট ডাকাতি এই সংস্কৃতি থেকে প্রতিটি রাজনেতিক দলকে বেড়িয়ে আসতে হবে। এর জন্য দরকার প্রতিটি দলের মধ্যে প্রকৃত গণতন্ত্র। দেশে বড় দুয়েকটা দল ছাড়া অন্যরা ৪ বছরের জন্য গণতন্ত্রের গ পর্যন্ত ভুলে যান। যখন নির্বাচনের বেশ কয়েক মাস আগে গণতন্ত্রের জন্য মায়া কান্না শুরু করে দেন। গণতন্ত্র একটা চলমান প্রক্রিয়া। জনগণকে গণতন্ত্রের মর্ম বুঝাতে ব্যর্থ হলে, গণতন্ত্রের বারটা বাজবে। তখন অর্থের কাছে বিক্রি হবে কষ্টার্জিত গণতন্ত্র।

 

সামনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তাই যেমন গণতন্ত্রের দরদ বেড়েছে, তেমনি দরদ বেড়েছে দেশের ছোট ছোট রাজনেতিক দলরেও। দলের নিবন্ধন আছে কিংবা নাই, দলের নিজস্ব ভোট ব্যাংক আছে কিংবা নাই এটা চিন্তার বিষয় না। চিন্তার বিষয় হলো জোট করে ক্ষমতার স্বাদ গ্রহন করা। আমাদের দেশে একটা প্রবাদ আছে ” এত লালি আধজের না ” জনবিছিন্ন কোন দল বা ব্যক্তি দিয়ে এক্য হলে, জাতি মতৈক্য ছাড়া আর কিছুই দেখবেনা। গণতন্ত্রে সুফল / কুফল দুটোই আছে। আর গণতন্ত্র মানে শুধু ভোটের অধিকার না, ভাতের ও অধিকার। গণতন্ত্র মানে দেশের সার্বভৌমত্বকে রক্ষার অধিকার। গণতন্ত্র দেশের মানুষের মৌলিক অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করবে । গণতন্ত্রের মানবিক দৃষ্টিকোণ থাকবে অবহেলিত জনগোষ্ঠীর পক্ষে। বর্তমান সরকার একাদশ জাতীর সংসদ নির্বাচনে প্রমাণ করতে হবে, উন্নয়ন ও গণতন্ত্র দুটোই আমার কাছে সমান। দেশে নির্বাচনকালীন সরকার সকল দলের সমন্বয়ে গঠন করতে হবে। দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেওয়া নির্বাচন কমিশনের যেমন নৈতিক দায়িত্ব তেমনি নির্বাচনকালীন সরকারেও।

 

দেশ থেকে আজ অভাব, অনটন, আকাল, সবচেয়ে অশুভ শব্দ মঙ্গা উন্নয়নের ছোঁয়ায় বিতাড়িত হয়েছে। জঙ্গিবাদের মতো কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে, আওয়ামীলীগ সরকার মাথা পিছু ঋণের পরিমান কমিয়ে দেশেকে আজ বিশ্বের মধ্য আয়ের দেশের কাতারে নিয়ে গেছে। আমাদের দেশের অর্থনীতির সূচক ভারত, পাকিস্তানের চেয়েও উপরে। তারপরও যদি আওয়ামীলীগ সরকারকে জনগণ ভোট না দেয়, তাহলে বুঝতে হবে গণতন্ত্র অর্থনীতি বুঝেনা। অন্যদিকে হতে পারে আওয়ামীলীগ তাদের সরকারের উন্নয়নের বার্তা ভোটারদের কাছে পোঁছাতে পারেনি অথবা জনগণের হার্টবিট বুঝতে পারেনি সরকার।

নিউজটি শেয়ার করুন:

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মো: আবুল কালাম আজাদ, খোকন
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : কামাল হোসেন খান
সম্পাদক : এডভোকেট মো: ফেরদৌস খান
বার্তা সম্পাদক : মো: সো‌হেল অাহ‌ম্মেদ
মফস্বল বিভাগ প্রধান: উত্তম কুমার হাওলাদার
Email: info@kuakatanews.com
যোগাযোগ: বাড়ী- ৫০৬/এ, রোড- ৩৫,
মহাখালী, ডি ও এইচ এস, ঢাকা- ১২০৬,
ফোন: +৮৮ ০১৭৩১ ৬০০ ১৯৯, ৯৮৯১৮২৫,
বার্তা এবং বিজ্ঞাপন : + ৮৮ ০১৬৭৪ ৬৩২ ৫০৯।
বিজ্ঞাপন এবং নিউজ : + ৮৮ ০১৭১৬ ৮৯২ ৯৭০।
News: editor.kuakatanews@gmail.com

© Copyright BY KuakataNews.Com

Design & Developed BY PopularITLimited