ইসলামে ওযুর গুরুত্ব ও উপকারিতা

ডাঃ হাফেজ মাওলানা মোঃ সাইফুল্লাহ মানসুর: ইসলামি বিধান মতে অযু হল দেহের অঙ্গ-প্রতঙ্গ ধৌত করার মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জনের একটি উত্তম পন্থা। যার মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করা যায় এবং এর মাধ্যমে ইসলামের গুরুত্বপূর্ন ইবাদাত গুলের মধ্যে বিশেষ করে নামাজ আদায় ও কুরআন তেলাওয়াত করা হয়। নাযাম ও কুরআন তেলাওয়াত করার জন্য অবশ্যই পবিত্রতা অর্জন করা প্রয়োজন । কারণ পবিত্রতা ছাড়া আল্লাহ তাআলার কাছে নামায গৃহীহ হবে না।

 

এ সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেনঃ
ﻻَ ﻳَﻘْﺒَﻞُ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﺻَﻼَﺓَ ﺃَﺣَﺪِﻛُﻢْ ﺇِﺫَﺍ ﺃَﺣْﺪَﺙَ ﺣَﺘَّﻰ ﻳَﺘَﻮَﺿَّﺄَ “আল্লাহ তাআলা তোমাদের কারও নামায গ্রহণ করবেন না, যখন সে অপবিত্র হয়ে যায়, যতক্ষন না সে অযু করে। (বুখারী ও মুসলিম)

অন্য এক হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী “নামাজকে বলা হয় জান্নাতের চাবি আর ওযুকে বলা হয় নামাজের চাবি” পবিত্র কোরানে আছে –“নিশ্চই আল্লাহ্ তওবাকারীকে ভালবাসেন এবং যাহারা পবিত্র থাকে তাদেরকেও ভালবাসেন।” অনুরূপভাবে কুরআনন শরীফ পড়তে ও স্পর্শ করতেও অযুর প্রয়োজন হয়। পবিত্র কোরানে আছে -“যাহারা পূত-পবিত্র তাহারা ব্যতীত অন্য কেহ তাহা স্পর্শ করো না।“[১] (সূরা ওয়াক্কিয়াহ্, আয়াত:৭৯)। দেহ ও পরিধেয় কাপড়ের পবিত্রতা আর্জনকে বলা হয় তাহারাত্। অযু বা গোসলের মাধ্যমে সেই তাহারাত্ আর্জন করা যায়। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) বলেন – “পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ধর্মের অর্ধেক।“ (সহীহ মুসলিম)। অতএব প্রত্যেকটা মুমিনের উচিৎ ওযু বা তাহারাত সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারনা রাখা ও সব সময় ওযু অবস্থায় থাকা।

 

অযুর ফরজ ফরজসমূহ: যেমন
১.মুখমন্ডল পরিপূর্ণ ধৌত করা। ২. দুই হাত কনূই পর্যন্ত ধৌত করা। ৩. মাথার এক চতুর্থাংশ মাসেহ করা (ভেজা হাত মাথায় বুলানো) । ৪. দুই পায়েরর টাকনু পর্যন্ত উত্তম রুপে ধৌত করা।। (ক্ষেত্র বিশেষ চামড়ার মোজার উপর মসেহ্ করা যাবে যাকে খুফস বলা হয়)। এ ফরজগুলি ছাড়াও আছে কিছু সুন্নাত ও মুস্তাহাব কাজ যার মাধ্যমে সুন্দরভাবে ওযু করা সম্ভব। তবে ফরজের কোন একটি কাজ বাদ পড়লে ওযু হবে না।

এ সম্পর্কে কোরআনে বর্নিত আছেঃ “হে মু’মিনগণ! যখন তোমরা সালাতের জন্য প্রস্তুত হবে তখন তোমরা তোমাদের মুখমন্ডল ও হাতের কনূই পর্যন্ত ধৌত কওে নিবে এবং তোমাদের মাথা মসেহ্ করবে এবং পা গ্রন্থি পর্যন্ত ধৌত করবে; যদি তোমরা আপবিত্র থাক, তবে বিশেষভাবে পবিত্র হয়ে নিবে।তবে তোমরা যদি অসুস্থ হও অথবা সফরে থাক অথবা তোমাদের কেহ শৌচস্থান হইতে আগমন করে, অথবা তোমরা স্ত্রীদের সহিত সংগম কর এবং পানি না পাও তবে পবিত্র মাটির দ্বারা তায়াম্মুম করবে এবং তখন তোমাদের মুখমন্ডল ও হাত মসেহ্ করবে। আল্লাহ্ তোমাদিগকে কষ্ট দিতে চান না; বরং তিনি তোমাদিগকে পবিত্র করিতে চান ও তোমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করতে চান, যাহাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর।(সূরা মায়িদা, আয়াত:৬)।

অযু ভঙ্গের কারণসমুহ:
কোন ব্যক্তি অযু করার পর কিছু নির্দিষ্ট কাজ না করলে তার অযু বলবৎ থাকে। কিন্তু ঐ কাজগুলো যখনই করা হয় তখনই অযু অকার্যকর হয়ে যায় যা অযু ভেঙ্গে হওয়াও বলে।

উযু ভঙ্গের কারণ ৭টি:
১. পায়খানা-পেশাবের রাস্তা দিয়ে কোন কিছু বের হওয়া।
২. অযু অবস্থায় মুখ ভরে বমি হলে।
৩. শরীরের ক্ষতস্থান হতে রক্ত, পুঁজ বা পানি বের হয়ে গড়িয়ে পড়লে।
৪. থুথুর সঙ্গে রক্তের ভাগ সমান বা বেশি হলে।
৫. চিৎ, কাৎ বা হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে গেলে।
৬. পাগল, মাতাল বা অচেতন হলে ।
৭. নামাযে উচ্চ আওয়াজে করে হাসলে।
যে পানি দিয়ে অযু করা যাবেঃ যেমন-
১.বৃষ্টির পানি ২.কূয়ার পানি যা ডাকা থাকে ৩. ঝর্ণার, সাগর, নদীর পানি ৪. বরফ গলা পানি ৫. বড় পুকুর বা টেঙ্কের পানি
যে পানি দিয়ে অযু হবে নাঃ যেমন-
১.অপরিচ্ছন্ন বা অপবিত্র পানি ২. ফল বা গাছ নিসৃতঃ পানি ৩. কোন কিছু মিশানোর কারণে যে পানির বর্ণ, গন্ধ, স্বাদ এবং গারত্ব পরিবর্তিত হয়েছে। ৪. অল্প পরিমাণ পানি: যাতে অপবিত্র জিনিস মিশে গেছে (যেমনঃ মূত্র, রক্ত, মল বা মদ)। ৫. অযু বা গোসলের জন্য ব্যবহৃত পানি। ৬. অপবিত্র (হারাম) প্রাণী, যেমনঃ শূকর, কুকুর ও আন্যান্য হিংস্র প্রানীর পানকৃত পানির আবশিষ্ট।
ওযুর উপকারীতা
ওযুতে চারটি উপকারি রয়েছে-
দুটি উপকার ধর্মীয় যথা- ১.পবিত্রতা অর্জন যা মনে প্রশান্তি আনে ২. শয়তানের প্ররোচনা দূর হয় যা মন থেকে অশান্তি দুর করে প্রফুল্লতা ফিরে আনে।
অন্ন দুটি উপকার শারীরিক যথা-৩. অন্তকরন সুদৃঢ় করে ৪. পদসমূহ মজবুত করে।।
মস্তিষ্কের সাথে যেহেতু অন্তরের সুগভির সম্পর্ক রয়েছে তাই ওযুর মাদ্ধমে মস্তিষ্ককে শক্তিশালী করা হয় অর্থাৎ শরীর ও মন শক্তিশালী হয়। এর মাধ্যমে অন্তকরন মজবুত ও পদসমূহ সুদৃঢ় করা যায়। যেমন পবিত্র কোরআনে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন-
হে নবী স্বরন কর সেই সময়ের কথা যখন আল্লাহ তোমাদেও উপর তন্দ্রা স্থাপন করেছিলেন স্বীয় সান্নিধান হতে তোমাদের উপর শান্তি স্থাপনের জন্ন । আর আসমান হতে তোমাদের উপর পানি বর্ষণ করেছিলেন যাতে সে পানি তোমাদেরকে পবিত্র করে। এবং তোমাদের থেকে শয়তানের প্ররোচনা দূর করেন এবং তোমাদের অন্তর সমূহ সুদৃঢ় করেন এবং তোমাদের পদসমূহ সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। (সুরা আনফাল)
আর ক্রোধ দমনে রাসুল (সা) বলেছেন — ক্রোধ প্রকাশ করা শয়তানের কাজ এবং শয়তান আগুন হতে সৃষ্টি হয়েছে। আগুন পানি দারা নিভে যায়। অতএব তোমাদের মধ্যে কেউ রাগান্নিত হলে সে যেন ওযু করে নেয়
এ ছাড়াও কুরআন ও হাদীসের আলোকে ওযুর কিছু ফজিলত আলোকপাত করা হলো ঃ
১)ওযু কারিকে আল্লাহ তাআলার ভালবাসেন ঃ
অযু /ওযু হল পবিত্রতা, আর পবিত্রতা অর্জনকারীকে আল্লাহ তাআলা ভালবাসেন। এরশাদ হচ্ছে:
ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻳُﺤِﺐُّ ﺍﻟﺘَّﻮَّﺍﺑِﻴﻦَ ﻭَﻳُﺤِﺐُّ ﺍﻟْﻤُﺘَﻄَﻬِّﺮِﻳﻦَ
“নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তওবাকারীদের এবং পবিত্রা অর্জন কারীদেরকে ভালবাসেন।” (সূরা বাকারাঃ ২২২)
২) পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গঃ রাসুল (সঃ) বলেছেনঃ ﺍﻟﻄُّﻬُﻮﺭُ ﺷَﻄْﺮُ ﺍﻹِﻳﻤَﺎﻥِ “পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ।” (মুসলিম)
৩) ওযু কারীর জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেয়া হয়ঃ
যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সুন্দর ভাবে অযু করবে অত:পর অযুর শেষে নিম্ন বর্ণিত দুআ পাঠ করবে তার জন্যে
জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেয়া হবে, সে যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারবে।” দু’আটির বাংলা উচ্চারণ-
ঃ “আশহাদুআল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া
রাসূলুহু। আল্লাহুম্মাজআলনী মিনাত্ তাওয়্যাবীনা ওয়াজআলনী মিনাল মুতাত্বহহিরীন।” (তিরমিযী)
৪) ওযু কারীর জন্য জান্নাতের সুসংবাদ ঃ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
“যে কোন ব্যক্তি সুন্দর ভাবে অযু করে, একনিষ্ঠতার সাথে দুরাকাআত নামায আদায় করে তার জন্যে জান্নাত অবধারিত হয়ে যায়।” (মুসলিম)
৫) অযু এক নামায হতে অন্য নামাযের মধ্যে সংঘঠিত গুনাহের কাফফারাহ স্বরূপঃ
রাসুল (সঃ) এরশাদ করেনঃ
ﻣَﻦْ ﺃَﺗَﻢَّ ﺍﻟْﻮُﺿُﻮﺀَ ﻛَﻤَﺎ ﺃَﻣَﺮَﻩُ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﺗَﻌَﺎﻟَﻰ ﻓَﺎﻟﺼَّﻠﻮَﺍﺕُ
ﺍﻟْﻤَﻜْﺘُﻮﺑَﺎﺕُ ﻛَﻔَّﺎﺭَﺍﺕٌ ﻟِﻤَﺎ ﺑَﻴْﻨَﻬُﻦَّ
“যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী পরিপূর্ণ ভাবে অযু সম্পাদন করে, (তার জন্য) ফরয নামাযগুলোর মধ্যবর্তী সময়ে সংঘঠিত গুনাহের কাফ্ফারা হয়ে যায়।” (মুসলিম)
৬) ওযুর মাধ্যমে গুনাহ দূর হয়:
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল (সঃ) বলেছেন: “যখন একজন মুসলিম বা মু’মিন ব্যক্তি অযু করে, সে যখন তার চেহারা ধৌত করে পানির সাথে বা পানির শেষ বিন্দুর সাথে তার চেহারার গুনাহ সমূহ দূর হয়ে যায় যা তার দৃষ্টি দ্বারা হয়েছে। এমনিভাবে সে যখন তার দুহাত ধৌত করে তার হাতের গুনাহ সমূহ যা হাত দিয়ে ধরার মাধ্যমে করেছে তা পানির সাথে বা পানির শেষ বিন্দুর সাথে দূর হয়ে যায়। আবার যখন দু’পা ধৌত কওে পায়ের গুনাহ সমূহ যা পা দিয়ে চলার মাধ্যমে হয়েছে তা পানির সাথে বা পানির শেষ বিন্দুর সাথে দূর হয়ে যায়। শেষ পর্যন- সে গুনাহ হতে সম্পূর্ণ পবিত্র হয়ে যায়। (মুসলিম)

 

৭) অযুর অংগ প্রত্যংগ গুলো কিয়ামতের দিন আলোকিত হবে:
আবু হুরায়রা হতে বর্ণিত তিনি বলেন, সাহাবাগণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার উম্মত যারা আপনার পরে আসবে তাদেরকে আপনি কিভাকে পরিচয় পাবেন? তিনি বললেন” “আমার উম্মতগণ কিয়ামতের দিন অযুর স্থানগুলো আলোকীত অবস্থায় উপস্তিত হবে।” (মুসলিম)
৮) ঘূমানোর পূর্বে অযু করা দুআ কবুল হওয়ার কারণঃ
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “কোন মুসলিম ব্যক্তি যখন অযু করে নিদ্রায় যায়, রাত্রিতে জেগে দুনিয়া এবং আখেরাতের কোন কল্যাণের দুআ করলে দুআ কবুল করা হয়।” (নাসাঈ)

লেখকঃ
চেয়ারম্যান,
সোস্যাল মিডিয়া দাওয়াতুল কুরআন ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ

 

নিউজটি শেয়ার করুন:
image_print

সর্বশেষ আপডেট



» প্রেমের টানে ছাত্রকে নিয়ে ম্যাডাম উধাও

» আগামী তিন মাসের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে চাকরি হারাতে পারেন বহু ভারতীয়র

» আফগানদের হারিয়ে ফাইনালের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখল বাংলাদেশ

» নায়লা নাঈম বাংলাদেশি সানি লিওন! ভারতের গণমাধ্যম

» ফতুল্লায় সতীন ও স্বামী অত্যাচারে অতিষ্ঠ সীমা

» ফতুল্লায় ২৭১পিস ইয়াবা ১২০গ্রাম গাঁজাসহ- ৬

» মোনালিসা হত্যা মামলার আসামি দুবাই গ্রেফতার” আনা হলো ফতুল্লায়

» ফতুল্লা থানা ইসলামী ছাত্রসেনা কমিটির উদ্যোগে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত

» নওগাঁয় শীতকালিন আগাম শিম চাষে লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা দিন দিন বাড়ছে আবাদ

» স্বামীর অমানষিক নির্যাতনের শিকার গৃহবধু সেতু নওগাঁ হাসপাতালে

লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন

 



ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মো: আবুল কালাম আজাদ, খোকন
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : কামাল হোসেন খান
সম্পাদক : এডভোকেট মো: ফেরদৌস খান
বার্তা সম্পাদক : মো: সো‌হেল অাহ‌ম্মেদ
মফস্বল বিভাগ প্রধান: উত্তম কুমার হাওলাদার
Email: info@kuakatanews.com
যোগাযোগ: বাড়ী- ৫০৬/এ, রোড- ৩৫,
মহাখালী, ডি ও এইচ এস, ঢাকা- ১২০৬,
ফোন: +৮৮ ০১৭৩১ ৬০০ ১৯৯, ৯৮৯১৮২৫,
বার্তা এবং বিজ্ঞাপন : + ৮৮ ০১৬৭৪ ৬৩২ ৫০৯।
বিজ্ঞাপন এবং নিউজ : + ৮৮ ০১৭১৬ ৮৯২ ৯৭০।
News: editor.kuakatanews@gmail.com
Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
আজ সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দ, ৯ই আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

ইসলামে ওযুর গুরুত্ব ও উপকারিতা

ডাঃ হাফেজ মাওলানা মোঃ সাইফুল্লাহ মানসুর: ইসলামি বিধান মতে অযু হল দেহের অঙ্গ-প্রতঙ্গ ধৌত করার মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জনের একটি উত্তম পন্থা। যার মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করা যায় এবং এর মাধ্যমে ইসলামের গুরুত্বপূর্ন ইবাদাত গুলের মধ্যে বিশেষ করে নামাজ আদায় ও কুরআন তেলাওয়াত করা হয়। নাযাম ও কুরআন তেলাওয়াত করার জন্য অবশ্যই পবিত্রতা অর্জন করা প্রয়োজন । কারণ পবিত্রতা ছাড়া আল্লাহ তাআলার কাছে নামায গৃহীহ হবে না।

 

এ সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেনঃ
ﻻَ ﻳَﻘْﺒَﻞُ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﺻَﻼَﺓَ ﺃَﺣَﺪِﻛُﻢْ ﺇِﺫَﺍ ﺃَﺣْﺪَﺙَ ﺣَﺘَّﻰ ﻳَﺘَﻮَﺿَّﺄَ “আল্লাহ তাআলা তোমাদের কারও নামায গ্রহণ করবেন না, যখন সে অপবিত্র হয়ে যায়, যতক্ষন না সে অযু করে। (বুখারী ও মুসলিম)

অন্য এক হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী “নামাজকে বলা হয় জান্নাতের চাবি আর ওযুকে বলা হয় নামাজের চাবি” পবিত্র কোরানে আছে –“নিশ্চই আল্লাহ্ তওবাকারীকে ভালবাসেন এবং যাহারা পবিত্র থাকে তাদেরকেও ভালবাসেন।” অনুরূপভাবে কুরআনন শরীফ পড়তে ও স্পর্শ করতেও অযুর প্রয়োজন হয়। পবিত্র কোরানে আছে -“যাহারা পূত-পবিত্র তাহারা ব্যতীত অন্য কেহ তাহা স্পর্শ করো না।“[১] (সূরা ওয়াক্কিয়াহ্, আয়াত:৭৯)। দেহ ও পরিধেয় কাপড়ের পবিত্রতা আর্জনকে বলা হয় তাহারাত্। অযু বা গোসলের মাধ্যমে সেই তাহারাত্ আর্জন করা যায়। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) বলেন – “পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ধর্মের অর্ধেক।“ (সহীহ মুসলিম)। অতএব প্রত্যেকটা মুমিনের উচিৎ ওযু বা তাহারাত সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারনা রাখা ও সব সময় ওযু অবস্থায় থাকা।

 

অযুর ফরজ ফরজসমূহ: যেমন
১.মুখমন্ডল পরিপূর্ণ ধৌত করা। ২. দুই হাত কনূই পর্যন্ত ধৌত করা। ৩. মাথার এক চতুর্থাংশ মাসেহ করা (ভেজা হাত মাথায় বুলানো) । ৪. দুই পায়েরর টাকনু পর্যন্ত উত্তম রুপে ধৌত করা।। (ক্ষেত্র বিশেষ চামড়ার মোজার উপর মসেহ্ করা যাবে যাকে খুফস বলা হয়)। এ ফরজগুলি ছাড়াও আছে কিছু সুন্নাত ও মুস্তাহাব কাজ যার মাধ্যমে সুন্দরভাবে ওযু করা সম্ভব। তবে ফরজের কোন একটি কাজ বাদ পড়লে ওযু হবে না।

এ সম্পর্কে কোরআনে বর্নিত আছেঃ “হে মু’মিনগণ! যখন তোমরা সালাতের জন্য প্রস্তুত হবে তখন তোমরা তোমাদের মুখমন্ডল ও হাতের কনূই পর্যন্ত ধৌত কওে নিবে এবং তোমাদের মাথা মসেহ্ করবে এবং পা গ্রন্থি পর্যন্ত ধৌত করবে; যদি তোমরা আপবিত্র থাক, তবে বিশেষভাবে পবিত্র হয়ে নিবে।তবে তোমরা যদি অসুস্থ হও অথবা সফরে থাক অথবা তোমাদের কেহ শৌচস্থান হইতে আগমন করে, অথবা তোমরা স্ত্রীদের সহিত সংগম কর এবং পানি না পাও তবে পবিত্র মাটির দ্বারা তায়াম্মুম করবে এবং তখন তোমাদের মুখমন্ডল ও হাত মসেহ্ করবে। আল্লাহ্ তোমাদিগকে কষ্ট দিতে চান না; বরং তিনি তোমাদিগকে পবিত্র করিতে চান ও তোমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করতে চান, যাহাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর।(সূরা মায়িদা, আয়াত:৬)।

অযু ভঙ্গের কারণসমুহ:
কোন ব্যক্তি অযু করার পর কিছু নির্দিষ্ট কাজ না করলে তার অযু বলবৎ থাকে। কিন্তু ঐ কাজগুলো যখনই করা হয় তখনই অযু অকার্যকর হয়ে যায় যা অযু ভেঙ্গে হওয়াও বলে।

উযু ভঙ্গের কারণ ৭টি:
১. পায়খানা-পেশাবের রাস্তা দিয়ে কোন কিছু বের হওয়া।
২. অযু অবস্থায় মুখ ভরে বমি হলে।
৩. শরীরের ক্ষতস্থান হতে রক্ত, পুঁজ বা পানি বের হয়ে গড়িয়ে পড়লে।
৪. থুথুর সঙ্গে রক্তের ভাগ সমান বা বেশি হলে।
৫. চিৎ, কাৎ বা হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে গেলে।
৬. পাগল, মাতাল বা অচেতন হলে ।
৭. নামাযে উচ্চ আওয়াজে করে হাসলে।
যে পানি দিয়ে অযু করা যাবেঃ যেমন-
১.বৃষ্টির পানি ২.কূয়ার পানি যা ডাকা থাকে ৩. ঝর্ণার, সাগর, নদীর পানি ৪. বরফ গলা পানি ৫. বড় পুকুর বা টেঙ্কের পানি
যে পানি দিয়ে অযু হবে নাঃ যেমন-
১.অপরিচ্ছন্ন বা অপবিত্র পানি ২. ফল বা গাছ নিসৃতঃ পানি ৩. কোন কিছু মিশানোর কারণে যে পানির বর্ণ, গন্ধ, স্বাদ এবং গারত্ব পরিবর্তিত হয়েছে। ৪. অল্প পরিমাণ পানি: যাতে অপবিত্র জিনিস মিশে গেছে (যেমনঃ মূত্র, রক্ত, মল বা মদ)। ৫. অযু বা গোসলের জন্য ব্যবহৃত পানি। ৬. অপবিত্র (হারাম) প্রাণী, যেমনঃ শূকর, কুকুর ও আন্যান্য হিংস্র প্রানীর পানকৃত পানির আবশিষ্ট।
ওযুর উপকারীতা
ওযুতে চারটি উপকারি রয়েছে-
দুটি উপকার ধর্মীয় যথা- ১.পবিত্রতা অর্জন যা মনে প্রশান্তি আনে ২. শয়তানের প্ররোচনা দূর হয় যা মন থেকে অশান্তি দুর করে প্রফুল্লতা ফিরে আনে।
অন্ন দুটি উপকার শারীরিক যথা-৩. অন্তকরন সুদৃঢ় করে ৪. পদসমূহ মজবুত করে।।
মস্তিষ্কের সাথে যেহেতু অন্তরের সুগভির সম্পর্ক রয়েছে তাই ওযুর মাদ্ধমে মস্তিষ্ককে শক্তিশালী করা হয় অর্থাৎ শরীর ও মন শক্তিশালী হয়। এর মাধ্যমে অন্তকরন মজবুত ও পদসমূহ সুদৃঢ় করা যায়। যেমন পবিত্র কোরআনে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন-
হে নবী স্বরন কর সেই সময়ের কথা যখন আল্লাহ তোমাদেও উপর তন্দ্রা স্থাপন করেছিলেন স্বীয় সান্নিধান হতে তোমাদের উপর শান্তি স্থাপনের জন্ন । আর আসমান হতে তোমাদের উপর পানি বর্ষণ করেছিলেন যাতে সে পানি তোমাদেরকে পবিত্র করে। এবং তোমাদের থেকে শয়তানের প্ররোচনা দূর করেন এবং তোমাদের অন্তর সমূহ সুদৃঢ় করেন এবং তোমাদের পদসমূহ সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। (সুরা আনফাল)
আর ক্রোধ দমনে রাসুল (সা) বলেছেন — ক্রোধ প্রকাশ করা শয়তানের কাজ এবং শয়তান আগুন হতে সৃষ্টি হয়েছে। আগুন পানি দারা নিভে যায়। অতএব তোমাদের মধ্যে কেউ রাগান্নিত হলে সে যেন ওযু করে নেয়
এ ছাড়াও কুরআন ও হাদীসের আলোকে ওযুর কিছু ফজিলত আলোকপাত করা হলো ঃ
১)ওযু কারিকে আল্লাহ তাআলার ভালবাসেন ঃ
অযু /ওযু হল পবিত্রতা, আর পবিত্রতা অর্জনকারীকে আল্লাহ তাআলা ভালবাসেন। এরশাদ হচ্ছে:
ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻳُﺤِﺐُّ ﺍﻟﺘَّﻮَّﺍﺑِﻴﻦَ ﻭَﻳُﺤِﺐُّ ﺍﻟْﻤُﺘَﻄَﻬِّﺮِﻳﻦَ
“নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তওবাকারীদের এবং পবিত্রা অর্জন কারীদেরকে ভালবাসেন।” (সূরা বাকারাঃ ২২২)
২) পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গঃ রাসুল (সঃ) বলেছেনঃ ﺍﻟﻄُّﻬُﻮﺭُ ﺷَﻄْﺮُ ﺍﻹِﻳﻤَﺎﻥِ “পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ।” (মুসলিম)
৩) ওযু কারীর জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেয়া হয়ঃ
যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সুন্দর ভাবে অযু করবে অত:পর অযুর শেষে নিম্ন বর্ণিত দুআ পাঠ করবে তার জন্যে
জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেয়া হবে, সে যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারবে।” দু’আটির বাংলা উচ্চারণ-
ঃ “আশহাদুআল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া
রাসূলুহু। আল্লাহুম্মাজআলনী মিনাত্ তাওয়্যাবীনা ওয়াজআলনী মিনাল মুতাত্বহহিরীন।” (তিরমিযী)
৪) ওযু কারীর জন্য জান্নাতের সুসংবাদ ঃ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
“যে কোন ব্যক্তি সুন্দর ভাবে অযু করে, একনিষ্ঠতার সাথে দুরাকাআত নামায আদায় করে তার জন্যে জান্নাত অবধারিত হয়ে যায়।” (মুসলিম)
৫) অযু এক নামায হতে অন্য নামাযের মধ্যে সংঘঠিত গুনাহের কাফফারাহ স্বরূপঃ
রাসুল (সঃ) এরশাদ করেনঃ
ﻣَﻦْ ﺃَﺗَﻢَّ ﺍﻟْﻮُﺿُﻮﺀَ ﻛَﻤَﺎ ﺃَﻣَﺮَﻩُ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﺗَﻌَﺎﻟَﻰ ﻓَﺎﻟﺼَّﻠﻮَﺍﺕُ
ﺍﻟْﻤَﻜْﺘُﻮﺑَﺎﺕُ ﻛَﻔَّﺎﺭَﺍﺕٌ ﻟِﻤَﺎ ﺑَﻴْﻨَﻬُﻦَّ
“যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী পরিপূর্ণ ভাবে অযু সম্পাদন করে, (তার জন্য) ফরয নামাযগুলোর মধ্যবর্তী সময়ে সংঘঠিত গুনাহের কাফ্ফারা হয়ে যায়।” (মুসলিম)
৬) ওযুর মাধ্যমে গুনাহ দূর হয়:
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল (সঃ) বলেছেন: “যখন একজন মুসলিম বা মু’মিন ব্যক্তি অযু করে, সে যখন তার চেহারা ধৌত করে পানির সাথে বা পানির শেষ বিন্দুর সাথে তার চেহারার গুনাহ সমূহ দূর হয়ে যায় যা তার দৃষ্টি দ্বারা হয়েছে। এমনিভাবে সে যখন তার দুহাত ধৌত করে তার হাতের গুনাহ সমূহ যা হাত দিয়ে ধরার মাধ্যমে করেছে তা পানির সাথে বা পানির শেষ বিন্দুর সাথে দূর হয়ে যায়। আবার যখন দু’পা ধৌত কওে পায়ের গুনাহ সমূহ যা পা দিয়ে চলার মাধ্যমে হয়েছে তা পানির সাথে বা পানির শেষ বিন্দুর সাথে দূর হয়ে যায়। শেষ পর্যন- সে গুনাহ হতে সম্পূর্ণ পবিত্র হয়ে যায়। (মুসলিম)

 

৭) অযুর অংগ প্রত্যংগ গুলো কিয়ামতের দিন আলোকিত হবে:
আবু হুরায়রা হতে বর্ণিত তিনি বলেন, সাহাবাগণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার উম্মত যারা আপনার পরে আসবে তাদেরকে আপনি কিভাকে পরিচয় পাবেন? তিনি বললেন” “আমার উম্মতগণ কিয়ামতের দিন অযুর স্থানগুলো আলোকীত অবস্থায় উপস্তিত হবে।” (মুসলিম)
৮) ঘূমানোর পূর্বে অযু করা দুআ কবুল হওয়ার কারণঃ
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “কোন মুসলিম ব্যক্তি যখন অযু করে নিদ্রায় যায়, রাত্রিতে জেগে দুনিয়া এবং আখেরাতের কোন কল্যাণের দুআ করলে দুআ কবুল করা হয়।” (নাসাঈ)

লেখকঃ
চেয়ারম্যান,
সোস্যাল মিডিয়া দাওয়াতুল কুরআন ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ

 

নিউজটি শেয়ার করুন:
image_print

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মো: আবুল কালাম আজাদ, খোকন
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : কামাল হোসেন খান
সম্পাদক : এডভোকেট মো: ফেরদৌস খান
বার্তা সম্পাদক : মো: সো‌হেল অাহ‌ম্মেদ
মফস্বল বিভাগ প্রধান: উত্তম কুমার হাওলাদার
Email: info@kuakatanews.com
যোগাযোগ: বাড়ী- ৫০৬/এ, রোড- ৩৫,
মহাখালী, ডি ও এইচ এস, ঢাকা- ১২০৬,
ফোন: +৮৮ ০১৭৩১ ৬০০ ১৯৯, ৯৮৯১৮২৫,
বার্তা এবং বিজ্ঞাপন : + ৮৮ ০১৬৭৪ ৬৩২ ৫০৯।
বিজ্ঞাপন এবং নিউজ : + ৮৮ ০১৭১৬ ৮৯২ ৯৭০।
News: editor.kuakatanews@gmail.com

© Copyright BY KuakataNews.Com

Design & Developed BY PopularITLimited