সাংবাদিকতার একাল সেকাল -রণজিৎ মোদক

সময় আর নদীর স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করেনা। তবে স্রোত আটকাতে না পারলেও মানুষ সময়কে স্মৃতি পটে জড়িয়ে রাখে সবসময়। জীবনের এ প্রান্তে এসে আমারো বার বার হারানো দিনের কথাগুলো মনে পড়ে। ১৯৭৮ সালে ঢাকা জেলার কেরাণীগঞ্জ থানাধীন কোন্ডা ইউনিয়নের পারজোয়ার ব্রাহ্মনগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা দিয়ে শুরু হয় কর্মজীবন। এ স্কুলেরই একজন শিক্ষক বাবু শান্তি রাম মোদকের স্নেহে আমাকে সত্যিকারের শিক্ষক হিসেবে গড়তে অনুপ্রেরণা দেয়। এ ক্ষেত্রে আমার প্রিয় শিক্ষক ও কবি মুজাফ্ফর আলী তালুকদার ছিলেন আমার আদর্শ। হাই স্কুলে পড়ার সময় সাহিত্যের প্রতি টান অনুভব করি। টুকটাক লেখালেখি শুরু তখন থেকেই। এ দেখে আমার এক ছাত্র গাজী শাখাওয়াত আরিফ একদিন বলল, স্যার আপনি কবিতা-গল্প লিখেন ইচ্ছে করলে সাংবাদিকতা করতে পারেন। তার এই কথায় মনের কোণে কৈশোরের এক সুপ্ত বাসনা যেন জেগে উঠল।

 

তখন পাকিস্তান আমল। আমার ভগ্নিপতি মনীন্দ্র মোহন মোদকের বাসায় সাপ্তাহিক মার্কিন পরিক্রমা রাখতেন। সেই পত্রিকা পড়ে সাংবাদিক হওয়ার ইচ্ছা মনের মধ্যে পাখা মেলে। তখন ভাবতাম কেমন করে একজন সাংবাদিক এত খবর সংগ্রহ করে তা পত্রিকায় প্রকাশ করে। এদিকে আরিফ নিজেও একসময় সাংবাদিকতা শুরু করেছে। মাঝে মধ্যে তার ছাপানো লেখা দেখাতো আর আমাকে সাংবাদিক হওয়ার তাগাদা দিত। ১৯৮৫ সালের কোন এক সময় সে আমাকে ঢাকার সদরঘাটের লালকুটিস্থ দৈনিক নব অভিযান পত্রিকা অফিসে নিয়ে বার্তা সম্পাদক আতাউর রহমানের সাথে পরিচয় করে দেয়। তখনই ওই অফিসে বসে নিউজপ্রিন্টের ছোট একটি কাগজে একটি সংবাদ লিখে জমা দিলাম। পরের দিন তা পত্রিকায় ছাপা অক্ষরে দেখে উৎসাহ যেন কয়েকগুন বেড়ে গেল। এভাবেই আমার জীবনে শুরু হল মানুষ গড়ার মহান পেশা শিক্ষকতার সাথে সমাজ গড়ার মহান পেশা সাংবাদিকতা। আমাকে কেরাণীগঞ্জ থানা প্রতিনিধি করা হল। একদিকে মনে আনন্দের ঢেউ অপরদিকে জাগ্রত বিবেকে এক কঠিন প্রশ্নের উদয়। আমি পারবতো সমাজের বিবেক বলে পরিচিত এই মহান পেশার সম্মান অক্ষুন্ন রাখতে? আজকের মত তখন সাংবাদিকতা এত সহজ ছিল না। সারা দেশের মত কেরাণীগঞ্জে যোগাযোগ ব্যবস্থাও তত ভাল নয়। ফতুল্লায় বসবাস করে কেরাণীগঞ্জের মাঠঘাট চষে খবর সংগ্রহ এক কঠিন কাজ। সংবাদের খোঁজে তখন সদরঘাট থেকে জিঞ্জিরা, কোনাখোলা, হযরতপুর, টেগুরিয়া চষে বেড়াতাম। সেই সংবাদ আবার লঞ্চে করে সদরঘাট গিয়ে পত্রিকা অফিসে দিয়ে আসতাম। পত্রিকা ছাপানোও ছিল কষ্টসাধ্য কাজ। হাতে কম্পোজ করে (ব্লক হাতে অক্ষর সেট করা) পরে তা লেটার প্রেসে ছাপানো হত। প্রেসের সেই খট খট শব্দ আজো কানে বাজে। এদিকে শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতার পাশাপাশি কাব্যচর্চ্চাও সমান তালে চালিয়ে যেতে লাগলাম। এক সময় কবি সামসুল হকের মাধ্যমে কবি সংগঠন অনুপ্রাস নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখা গঠন করি। এক পর্যায়ে দৈনিক নব অভিযান পত্রিকায় আমাকে ফতুল্লা প্রতিনিধি পরে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি করলো।

 

এসময় পরিচিত হই নারায়ণগঞ্জের অনেক গুণী সাংবাদিকদের সাথে। যাদের মধ্যে বংশী সাহা, মজিবর রহমান বাদল, অহিদুল হক খান, ইউসুফ আলী এটম, হালিম আজাদ, বিমল রায়, শামসুল সালেহীন, মনির হোসেন, শংকর কুমার দে, বিমান ভট্টাচার্য, সুভাষ সাহা, হাবিবুর রহমান বাদল, বিনয় রায় ও মহিউদ্দিন আকবরসহ আরো অনেকে। তখন সবাই খুব কষ্ট করে সাংবাদিকতা করতেন। সংবাদ সংগ্রহ করতে যেমন কষ্ট তেমনি ঢাকা অফিসে পাঠাতেও কষ্ট কম ছিলনা। হাতে লেখা সংবাদের কাগজ নিয়ে সন্ধ্যায় মুড়ির টিন বাসে করে পত্রিকা অফিসে ছুটতে হতো। জরুরী কোন সংবাদ হলে টিএন্ডটি অফিসের এনালগ ফোন ছিল একমাত্র ভরসা। যদিও লাইন পাওয়া ছিল সোনার হরিণের মত। আমার এখনো মনে আছে ১৯৮৮ সালে ভয়াবহ বন্যার কথা। ঢাকা-পাগলা-নারায়ণগঞ্জ সড়কে যান চলাচল তখন বন্ধ ছিল। সেসময় ফতুল্লা থেকে পায়ে হেঁটে পোস্তগোলা হয়ে লালকুঠিস্থ পত্রিকা অফিসে যেতাম। অনেক সময় আমার সঙ্গী ছিল সেই প্রিয় ছাত্র আরিফ ও বাবুল কর্মকার। তবে এত কষ্টের মধ্যেও প্রবল আনন্দে কাজ করতাম তখন। কারণ সে সময়ে সাংবাদিকদের উপরে মানুষের অগাধ শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস ছিল। এখন যে একেবারে নেই তা বলছি না। তবে কতটুকু নিখাঁদ সে প্রশ্ন বিভিন্ন মহলে উঠেছে।

 

সে সময় সাংবাদিকদের মধ্যে পরস্পর ভক্তি শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতার কমতি ছিল না। আজকের মত এত বিভেদ, প্রতিহিংসা, চাটুকারি সাংবাদিকতার স্থান তখন ছিল না। কে কোন দল করল কিংবা করল না তা নিয়েও মাথা ব্যাথা ছিল না। সাংবাদিকদের তখন সমাজের সূধীজন হিসেবেই গণ্য করা হত। সে সময়ে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবসহ বিভিন্ন জায়গায় সাংবাদিকদের অগ্রাধিকার দেয়া হত। দৈনিক নব অভিযানের জেলা প্রতিনিধি হিসেবে আমি নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সদস্য পদ লাভ করি। এক পর্যায়ে সাংবাদিক এ আর কামালের মাধ্যমে আমি সাপ্তাহিক সকাল বার্তা’র চীফ রিপোর্টার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহন করি। সম্পাদক মুজিবর রহমান বাদল ভাইয়ের সাথে একই অফিসে বসে দীর্ঘদিন কাজ করি। তখন সাংবাদিক পিয়ার চাঁনকে (বাদল ভাই যাকে প্রেমচাঁদ বলতেন) নিয়ে চষে বেড়িয়েছি রূপগঞ্জ, সোনারগাঁ, বন্দর, আড়াইহাজারসহ নারায়ণগঞ্জের অলিগলি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ও জাপার সাবেক চেয়ারপার্সন হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদের অনেক সমাবেশে উপস্থিত থেকে সংবাদ সংগ্রহ করেছি। নিরাপত্তার নামে এত কড়াকড়ি তখন ছিলনা।

 

সে সময়ে শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গার নদীর জল ছিল স্বচ্ছ। টলমলে সেই জলে প্রতিবিম্ব দেখা খুব সহজ ছিল। তখন সাংবাদিকতাও ছিল স্বচ্ছ। মানুষের জন্য সাংবাদিকতা এ নীতিতে বিশ্বাসী হয়েই মহান এই পেশায় ব্রত নিয়েছিলাম। তবে কালের পরিক্রমায় নদীর জল আর স্বচ্ছ নেই। চোখে পড়েনা নদীর বুকে কিশোরের সরল ঝাপ দেওয়ার চিত্র। তেমনি সাংবাদিকতায়ও সরলতা নেই, নেই স্বচ্ছতা। এখন অনেক সুযোগ সুবিধা। অফিসে না গিয়েও ই-মেইল করে মুহূর্তেই সংবাদ পাঠানো যায় দেশ থেকে বিদেশ পর্যন্ত। ছাপার কাজেও প্রযুক্তি এনে দিয়েছে সহজলভ্যতা। এ সুযোগে যে খুশী সেই পত্রিকা বের করে সম্পাদক হয়ে যায়। শুনেছি ক’দিন আগে লেবারের কাজ করা জনৈক ব্যাক্তি সাংবাদিক পরিচয়ে দাপড়ে বেড়ায় অপরাধ জগৎ। নাম লিখতে গিয়ে হাতের কাঁপুনি ধরে এমন অনেকেই বুক ফুলিয়ে বলে ‘আমি সাংবাদিক’। আবার কেউ দল ভারি করতে পরিবারের সদস্য কিংবা আত্মীয় স্বজনকে সাংবাদিক বানিয়ে দেয় নিমিষেই। এ পরিচয়ে এক সময় গর্ব অনুভব করলেও এখন খানিকটা লজ্জাই পাই এসব দেখে। সময় একদিন আসবেই যখন অপ-সাংবাদিকরা পালিয়ে যাবে মহান এই পেশা থেকে। এই মহান পেশায় নতুন প্রজন্মের নবীনরা এগিয়ে আসবে এই আশা অবশ্যই করি। সত্যিকারের সাংবাদিকরাই সত্য লেখনীর মাধ্যমে এ দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

 

সংবাদ ও সাংবাদিকতা নিয়ে যত কথাই বলিনা কেন? সংবাদ হচ্ছে সমাজের দর্পণ আর সাংবাদিক হচ্ছে জাতির বিবেক। এই বিবেক কলুষিত করা যাবেনা। একজন সাংবাদিক যথেষ্ট পরিশ্রম ও ত্যাগের মাধ্যমে দেশপ্রেম বুকে ধারণ করে কাজ করে। একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক সাংবাদিকের লেখনীর মাধ্যমে ঘুমন্ত জাতিকে জাগ্রত করতে পারে উন্নয়নের দ্বার উন্মোচন করে দিতে পারে। একটি জাতিকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দিতে পারে। উন্নত বিশ্বের ন্যায় আমাদের দেশের সরকারের উচিৎ জাতির স্বার্থেই সাংবাদিকদের উন্নত প্রশিক্ষন ও জাতীয়করণ করা খুব বেশি প্রয়োজন। নাহলে আমরা পৃথিবীর ভূমন্ডল থেকে হারিয়ে যেতে পারি। সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে শুধু এটুকুই বলবো সাংবাদিককে অবশ্যই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে হবে এবং দেশপ্রেমিকের ন্যায় কাজ করবে। জাতির জন্য কাজ করা গর্বের বিষয়। যেসমস্ত সাংবাদিক দেশের জন্য কাজ করেছেন সেইসব গর্বিত সাংবাদিকদের জাতি আজও স্মরণ করেন।

লেখক :- রণজিৎ মোদক শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট

নিউজটি শেয়ার করুন:
image_print

সর্বশেষ আপডেট



» শ্রীমঙ্গলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয়

» নড়িয়াবাসীর জন্য শেখ হাসিনা’র দরজা খোলা : ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জেল হোসেন চৌধুরী মায়া

» রাজাপুরে ডিজিটাল পদ্ধতিতে স্কুল স্টুডেন্ট হাজিরার উদ্বোধন

» কালীগঞ্জ থেকে গ্রীল কেটে চুরি হওয়া মটর সাইকেল গোপালগঞ্জ থেকে উদ্ধার

» অভিনব কায়দায় গ্যাস সিলিন্ডারে ফেন্সিডিল পাচারকালে মহেশপুরের মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার

» ঝিনাইদহে পুলিশের অভিযানে ৮ জামায়াত কর্মীসহ ৬৩ জন গ্রেফতার, মাদকদ্রব্য উদ্ধার

» ঝিনাইদহে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট জেলা পর্যায়ের খেলার উদ্বোধন

» ঝিনাইদহে ৫৪টি দুর্ধর্ষ চুরি, চোর ধরে সিসি ক্যামেরায় সনাক্ত করতে পারে না পুলিশ !

» ফতুল্লায় মনির হত্যার আসামী গ্রেফতারে পুলিশের গড়িমসি,আসামীর মালামাল জব্দ!!

» যশোরের বেনাপোল চেকপোষ্ট থেকে ৫পিস স্বর্ণের বারসহ আটক-১

লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন

 



ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মো: আবুল কালাম আজাদ, খোকন
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : কামাল হোসেন খান
সম্পাদক : এডভোকেট মো: ফেরদৌস খান
বার্তা সম্পাদক : মো: সো‌হেল অাহ‌ম্মেদ
মফস্বল বিভাগ প্রধান: উত্তম কুমার হাওলাদার
Email: info@kuakatanews.com
যোগাযোগ: বাড়ী- ৫০৬/এ, রোড- ৩৫,
মহাখালী, ডি ও এইচ এস, ঢাকা- ১২০৬,
ফোন: +৮৮ ০১৭৩১ ৬০০ ১৯৯, ৯৮৯১৮২৫,
বার্তা এবং বিজ্ঞাপন : + ৮৮ ০১৬৭৪ ৬৩২ ৫০৯।
বিজ্ঞাপন এবং নিউজ : + ৮৮ ০১৭১৬ ৮৯২ ৯৭০।
News: editor.kuakatanews@gmail.com
Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
আজ বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দ, ৪ঠা আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

সাংবাদিকতার একাল সেকাল -রণজিৎ মোদক

সময় আর নদীর স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করেনা। তবে স্রোত আটকাতে না পারলেও মানুষ সময়কে স্মৃতি পটে জড়িয়ে রাখে সবসময়। জীবনের এ প্রান্তে এসে আমারো বার বার হারানো দিনের কথাগুলো মনে পড়ে। ১৯৭৮ সালে ঢাকা জেলার কেরাণীগঞ্জ থানাধীন কোন্ডা ইউনিয়নের পারজোয়ার ব্রাহ্মনগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা দিয়ে শুরু হয় কর্মজীবন। এ স্কুলেরই একজন শিক্ষক বাবু শান্তি রাম মোদকের স্নেহে আমাকে সত্যিকারের শিক্ষক হিসেবে গড়তে অনুপ্রেরণা দেয়। এ ক্ষেত্রে আমার প্রিয় শিক্ষক ও কবি মুজাফ্ফর আলী তালুকদার ছিলেন আমার আদর্শ। হাই স্কুলে পড়ার সময় সাহিত্যের প্রতি টান অনুভব করি। টুকটাক লেখালেখি শুরু তখন থেকেই। এ দেখে আমার এক ছাত্র গাজী শাখাওয়াত আরিফ একদিন বলল, স্যার আপনি কবিতা-গল্প লিখেন ইচ্ছে করলে সাংবাদিকতা করতে পারেন। তার এই কথায় মনের কোণে কৈশোরের এক সুপ্ত বাসনা যেন জেগে উঠল।

 

তখন পাকিস্তান আমল। আমার ভগ্নিপতি মনীন্দ্র মোহন মোদকের বাসায় সাপ্তাহিক মার্কিন পরিক্রমা রাখতেন। সেই পত্রিকা পড়ে সাংবাদিক হওয়ার ইচ্ছা মনের মধ্যে পাখা মেলে। তখন ভাবতাম কেমন করে একজন সাংবাদিক এত খবর সংগ্রহ করে তা পত্রিকায় প্রকাশ করে। এদিকে আরিফ নিজেও একসময় সাংবাদিকতা শুরু করেছে। মাঝে মধ্যে তার ছাপানো লেখা দেখাতো আর আমাকে সাংবাদিক হওয়ার তাগাদা দিত। ১৯৮৫ সালের কোন এক সময় সে আমাকে ঢাকার সদরঘাটের লালকুটিস্থ দৈনিক নব অভিযান পত্রিকা অফিসে নিয়ে বার্তা সম্পাদক আতাউর রহমানের সাথে পরিচয় করে দেয়। তখনই ওই অফিসে বসে নিউজপ্রিন্টের ছোট একটি কাগজে একটি সংবাদ লিখে জমা দিলাম। পরের দিন তা পত্রিকায় ছাপা অক্ষরে দেখে উৎসাহ যেন কয়েকগুন বেড়ে গেল। এভাবেই আমার জীবনে শুরু হল মানুষ গড়ার মহান পেশা শিক্ষকতার সাথে সমাজ গড়ার মহান পেশা সাংবাদিকতা। আমাকে কেরাণীগঞ্জ থানা প্রতিনিধি করা হল। একদিকে মনে আনন্দের ঢেউ অপরদিকে জাগ্রত বিবেকে এক কঠিন প্রশ্নের উদয়। আমি পারবতো সমাজের বিবেক বলে পরিচিত এই মহান পেশার সম্মান অক্ষুন্ন রাখতে? আজকের মত তখন সাংবাদিকতা এত সহজ ছিল না। সারা দেশের মত কেরাণীগঞ্জে যোগাযোগ ব্যবস্থাও তত ভাল নয়। ফতুল্লায় বসবাস করে কেরাণীগঞ্জের মাঠঘাট চষে খবর সংগ্রহ এক কঠিন কাজ। সংবাদের খোঁজে তখন সদরঘাট থেকে জিঞ্জিরা, কোনাখোলা, হযরতপুর, টেগুরিয়া চষে বেড়াতাম। সেই সংবাদ আবার লঞ্চে করে সদরঘাট গিয়ে পত্রিকা অফিসে দিয়ে আসতাম। পত্রিকা ছাপানোও ছিল কষ্টসাধ্য কাজ। হাতে কম্পোজ করে (ব্লক হাতে অক্ষর সেট করা) পরে তা লেটার প্রেসে ছাপানো হত। প্রেসের সেই খট খট শব্দ আজো কানে বাজে। এদিকে শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতার পাশাপাশি কাব্যচর্চ্চাও সমান তালে চালিয়ে যেতে লাগলাম। এক সময় কবি সামসুল হকের মাধ্যমে কবি সংগঠন অনুপ্রাস নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখা গঠন করি। এক পর্যায়ে দৈনিক নব অভিযান পত্রিকায় আমাকে ফতুল্লা প্রতিনিধি পরে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি করলো।

 

এসময় পরিচিত হই নারায়ণগঞ্জের অনেক গুণী সাংবাদিকদের সাথে। যাদের মধ্যে বংশী সাহা, মজিবর রহমান বাদল, অহিদুল হক খান, ইউসুফ আলী এটম, হালিম আজাদ, বিমল রায়, শামসুল সালেহীন, মনির হোসেন, শংকর কুমার দে, বিমান ভট্টাচার্য, সুভাষ সাহা, হাবিবুর রহমান বাদল, বিনয় রায় ও মহিউদ্দিন আকবরসহ আরো অনেকে। তখন সবাই খুব কষ্ট করে সাংবাদিকতা করতেন। সংবাদ সংগ্রহ করতে যেমন কষ্ট তেমনি ঢাকা অফিসে পাঠাতেও কষ্ট কম ছিলনা। হাতে লেখা সংবাদের কাগজ নিয়ে সন্ধ্যায় মুড়ির টিন বাসে করে পত্রিকা অফিসে ছুটতে হতো। জরুরী কোন সংবাদ হলে টিএন্ডটি অফিসের এনালগ ফোন ছিল একমাত্র ভরসা। যদিও লাইন পাওয়া ছিল সোনার হরিণের মত। আমার এখনো মনে আছে ১৯৮৮ সালে ভয়াবহ বন্যার কথা। ঢাকা-পাগলা-নারায়ণগঞ্জ সড়কে যান চলাচল তখন বন্ধ ছিল। সেসময় ফতুল্লা থেকে পায়ে হেঁটে পোস্তগোলা হয়ে লালকুঠিস্থ পত্রিকা অফিসে যেতাম। অনেক সময় আমার সঙ্গী ছিল সেই প্রিয় ছাত্র আরিফ ও বাবুল কর্মকার। তবে এত কষ্টের মধ্যেও প্রবল আনন্দে কাজ করতাম তখন। কারণ সে সময়ে সাংবাদিকদের উপরে মানুষের অগাধ শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস ছিল। এখন যে একেবারে নেই তা বলছি না। তবে কতটুকু নিখাঁদ সে প্রশ্ন বিভিন্ন মহলে উঠেছে।

 

সে সময় সাংবাদিকদের মধ্যে পরস্পর ভক্তি শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতার কমতি ছিল না। আজকের মত এত বিভেদ, প্রতিহিংসা, চাটুকারি সাংবাদিকতার স্থান তখন ছিল না। কে কোন দল করল কিংবা করল না তা নিয়েও মাথা ব্যাথা ছিল না। সাংবাদিকদের তখন সমাজের সূধীজন হিসেবেই গণ্য করা হত। সে সময়ে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবসহ বিভিন্ন জায়গায় সাংবাদিকদের অগ্রাধিকার দেয়া হত। দৈনিক নব অভিযানের জেলা প্রতিনিধি হিসেবে আমি নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সদস্য পদ লাভ করি। এক পর্যায়ে সাংবাদিক এ আর কামালের মাধ্যমে আমি সাপ্তাহিক সকাল বার্তা’র চীফ রিপোর্টার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহন করি। সম্পাদক মুজিবর রহমান বাদল ভাইয়ের সাথে একই অফিসে বসে দীর্ঘদিন কাজ করি। তখন সাংবাদিক পিয়ার চাঁনকে (বাদল ভাই যাকে প্রেমচাঁদ বলতেন) নিয়ে চষে বেড়িয়েছি রূপগঞ্জ, সোনারগাঁ, বন্দর, আড়াইহাজারসহ নারায়ণগঞ্জের অলিগলি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ও জাপার সাবেক চেয়ারপার্সন হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদের অনেক সমাবেশে উপস্থিত থেকে সংবাদ সংগ্রহ করেছি। নিরাপত্তার নামে এত কড়াকড়ি তখন ছিলনা।

 

সে সময়ে শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গার নদীর জল ছিল স্বচ্ছ। টলমলে সেই জলে প্রতিবিম্ব দেখা খুব সহজ ছিল। তখন সাংবাদিকতাও ছিল স্বচ্ছ। মানুষের জন্য সাংবাদিকতা এ নীতিতে বিশ্বাসী হয়েই মহান এই পেশায় ব্রত নিয়েছিলাম। তবে কালের পরিক্রমায় নদীর জল আর স্বচ্ছ নেই। চোখে পড়েনা নদীর বুকে কিশোরের সরল ঝাপ দেওয়ার চিত্র। তেমনি সাংবাদিকতায়ও সরলতা নেই, নেই স্বচ্ছতা। এখন অনেক সুযোগ সুবিধা। অফিসে না গিয়েও ই-মেইল করে মুহূর্তেই সংবাদ পাঠানো যায় দেশ থেকে বিদেশ পর্যন্ত। ছাপার কাজেও প্রযুক্তি এনে দিয়েছে সহজলভ্যতা। এ সুযোগে যে খুশী সেই পত্রিকা বের করে সম্পাদক হয়ে যায়। শুনেছি ক’দিন আগে লেবারের কাজ করা জনৈক ব্যাক্তি সাংবাদিক পরিচয়ে দাপড়ে বেড়ায় অপরাধ জগৎ। নাম লিখতে গিয়ে হাতের কাঁপুনি ধরে এমন অনেকেই বুক ফুলিয়ে বলে ‘আমি সাংবাদিক’। আবার কেউ দল ভারি করতে পরিবারের সদস্য কিংবা আত্মীয় স্বজনকে সাংবাদিক বানিয়ে দেয় নিমিষেই। এ পরিচয়ে এক সময় গর্ব অনুভব করলেও এখন খানিকটা লজ্জাই পাই এসব দেখে। সময় একদিন আসবেই যখন অপ-সাংবাদিকরা পালিয়ে যাবে মহান এই পেশা থেকে। এই মহান পেশায় নতুন প্রজন্মের নবীনরা এগিয়ে আসবে এই আশা অবশ্যই করি। সত্যিকারের সাংবাদিকরাই সত্য লেখনীর মাধ্যমে এ দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

 

সংবাদ ও সাংবাদিকতা নিয়ে যত কথাই বলিনা কেন? সংবাদ হচ্ছে সমাজের দর্পণ আর সাংবাদিক হচ্ছে জাতির বিবেক। এই বিবেক কলুষিত করা যাবেনা। একজন সাংবাদিক যথেষ্ট পরিশ্রম ও ত্যাগের মাধ্যমে দেশপ্রেম বুকে ধারণ করে কাজ করে। একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক সাংবাদিকের লেখনীর মাধ্যমে ঘুমন্ত জাতিকে জাগ্রত করতে পারে উন্নয়নের দ্বার উন্মোচন করে দিতে পারে। একটি জাতিকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দিতে পারে। উন্নত বিশ্বের ন্যায় আমাদের দেশের সরকারের উচিৎ জাতির স্বার্থেই সাংবাদিকদের উন্নত প্রশিক্ষন ও জাতীয়করণ করা খুব বেশি প্রয়োজন। নাহলে আমরা পৃথিবীর ভূমন্ডল থেকে হারিয়ে যেতে পারি। সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে শুধু এটুকুই বলবো সাংবাদিককে অবশ্যই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে হবে এবং দেশপ্রেমিকের ন্যায় কাজ করবে। জাতির জন্য কাজ করা গর্বের বিষয়। যেসমস্ত সাংবাদিক দেশের জন্য কাজ করেছেন সেইসব গর্বিত সাংবাদিকদের জাতি আজও স্মরণ করেন।

লেখক :- রণজিৎ মোদক শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট

নিউজটি শেয়ার করুন:
image_print

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মো: আবুল কালাম আজাদ, খোকন
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : কামাল হোসেন খান
সম্পাদক : এডভোকেট মো: ফেরদৌস খান
বার্তা সম্পাদক : মো: সো‌হেল অাহ‌ম্মেদ
মফস্বল বিভাগ প্রধান: উত্তম কুমার হাওলাদার
Email: info@kuakatanews.com
যোগাযোগ: বাড়ী- ৫০৬/এ, রোড- ৩৫,
মহাখালী, ডি ও এইচ এস, ঢাকা- ১২০৬,
ফোন: +৮৮ ০১৭৩১ ৬০০ ১৯৯, ৯৮৯১৮২৫,
বার্তা এবং বিজ্ঞাপন : + ৮৮ ০১৬৭৪ ৬৩২ ৫০৯।
বিজ্ঞাপন এবং নিউজ : + ৮৮ ০১৭১৬ ৮৯২ ৯৭০।
News: editor.kuakatanews@gmail.com

© Copyright BY KuakataNews.Com

Design & Developed BY PopularITLimited