কবি হেনা রহমান ও তার কাব্যোদ্যান

কবি হেনা রহমানের জন্ম ১৯৪৮ সালের ১ জানুয়ারি পশ্চিম বঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার বারাকপুরে। ২ বৎসর বয়সে তিনি সপরিবারে তৎকালীন পূর্ব বাংলা অর্থৎ বর্তমান বাংলাদেশে চলে আসেন এবং এই বয়সেই তার পিতৃবিয়োগ ঘটে। জীবনের প্রতি পদক্ষেপে প্রতিকুলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে ১৯৬৩ সালে তিনি তেজগাঁও পলিটেকনিক গার্লস হাইস্কুল হতে এস এস সি এবং ১৯৬৮ সালে ইডেন মহিলা মহাবিদ্যালয় হতে বিএ পাস করেন।

 

যুগলবন্দি জীবনের ৪০ বছর অতিক্রান্তের পর তার স্বামী না ফেরার দেশে চলে যান। কবির ২ পুত্র এবং ২ কন্যা সন্তানের সবাই প্রতিষ্ঠিত এবং যার যার সংসারে ব্যস্ত। নিঃসঙ্গ জীবনে বই-ই তার একমাত্র বিশ্বস্ত সঙ্গী।

 

শৈশবে বই পড়ার দুর্বার আকর্ষণই তাকে মননশীল সাহিত্য জগতের সন্ধান দেয়। আত্মনিয়োগ করেন কবিতা লেখায়। নিজের জীবন থেকে উপলব্ধি করেন পারিপার্শ্বিক জীবনের সুখ দুখ, হাসি কান্না। প্রকৃতির উদার ও অনিন্দ্যসুন্দর লাবণ্যসুধাও হৃদয়ের ক্যানভাসে ধারণ করেন তৈলচিত্রের উপমায়। সমাজের নানা অসঙ্গতিও উপলব্ধি করেন গভীর দৃষ্টি প্রক্ষেপণের মাধ্যমে। আর কাব্যের শরীর নির্মাণ করতে থাকেন এসব বিচিত্র উপাদানের সমন্বয়ে। প্রেম, প্রতিবাদ, সাম্যবাদ, জীবন সংগ্রাম, আদর্শবাদিতা, মানবধর্মিতা, সমাজ চেতনা, মাতৃত্বের কোমলতা, স্বদেশ প্রেম তার কবিতার প্রধান উপজীব্য বিষয়। কবির সৌন্দর্য চেতনা দেশ ও মৃত্তিকা নির্ভর। নিজে নারী হওয়ার পরও তার সৌন্দর্য চেতনায় নারীর চেয়ে নিসর্গের প্রতাপ লক্ষ্যণীয়।

 

কবি হেনা রহমান নিভৃতচারী এক আধুনিক কবি। মারাত্মক ব্রেনস্ট্রোক করে ফিরে আসেন মৃত্যুর দুয়ার হতে। কিন্তু মুখ ফিরাতে পারেননি কবিতার জগত থেকে। এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত কাব্য গ্রন্থের সংখ্যা ৪টি, (১। অমরাবতী-প্রকাশকাল, একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৪), (২। আনন্দের কান্না-প্রকাশকাল, একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৫), (৩। আমি চাইনি বুট জুতার কঠোর শব্দ-প্রকাশকাল, একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৭), (৪। ফিরে যাও পিছনে-প্রকাশকাল, একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৮)। এখনও তিনি সমাজ ও সভ্যতার অসঙ্গতি কাব্যিক ভাষাদানের মাধ্যমে সমাজ সংস্কারের ভূমিকায় অগ্রণী সৈনিকের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। নিঃসঙ্গ সময় কাটাচ্ছেন লেখালেখি আর সাংস্কৃতিক সংগঠনে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে। বর্তমানে তিনি অনুপ্রাস জাতীয় কবি সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য।

 

অস্থির সময়ে সুস্থির কবি হেনা রহমান খুব সহজেই সকলের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হন তার শান্তশিষ্ট মার্জিত আচরণের মাধ্যমে। ভদ্র, বিনয়ী, স্থিতধী, মিতভাষী কবির সংযত বচন ও ব্যবহারের ভিতর থেকে তার চরিত্রের সরলতা এবং উদারতা স্বতঃধারায় প্রকাশিত।

 

কর্ণফুলি নদীর তীরে মনোরম প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা কবি পান অমরাবতীর সন্ধান। কিন্তু সেখানে ঠাঁই হয়নি তার। চক্ষুসরোবরে প্লাবিত বেদনার জল কর্ণফুলির স্বচ্ছ জলে ঢেলে দিয়ে স্বপ্নের আপন অমরাবতী ভুবন রচনা করতে গিয়েও হলো না রচনা। আর অষ্টাদশী যুবতির প্রথম প্রেমের ইন্দ্রনীলে হানা দেয় দুর্জয় জলোচ্ছ্বাস। ভালোবাসার শুকপাখি অন্তরে বাসা বাঁধার আগেই হয় জলস্রোতে বিলীন। “সাজানো বাসর, গ্রথিত ফুলের মালা/নিমেষে দুপায়ে দলে চলে গেল/নির্দয় নিষ্ঠুর পদক্ষেপে/দোতলার সবগুলো সিঁড়ি বেয়ে/আমার হৃদয়সমুদ্রে তখন বিক্ষুব্ধ ঝড়!” (পরাজয়-অমরাবতী গ্রন্থ) সেই ঝড়ে ঘর গেল, পর হলো আপন মানুষ, হারালো নীড়ের ঠিকানা। চেনা জানা সব মানুষ হয়ে গেল অচেনা। পরাজয়ের অতল অন্ধকারে হারিয়ে গেলো জীবনের চেনা পথ। তার পর শুধু বেঁচে থাকা। “আমার প্রথম প্রেম/অষ্টাদশী যখন আমি/মরা পাতার মতো ঝরে গেল/পরবর্তীতে যাকে ভালোবাসবো/তাকেও পাইনি খুঁজে আর…”(আমার প্রথম প্রেম-আনন্দের কান্না গ্রন্থ) কবির হৃদয়ে বাসা বাঁধলো প্রথম প্রেম হারানোর হাহাকার! প্রথম প্রেম হারানোর বেদনাই হয়তো তার ভিতরে কবিসত্তার জন্ম দিয়েছে। যেমন দিয়েছিলো নার্গিস কবি নজরুল ইসলামকে। হারানো প্রেমের দুঃসহ বেদনার চিত্র ফুটে ওঠে বিভিন্ন লোক গানে। “কর্ণফুলি রে সাক্ষী রাখিলাম তোরে/অভাগিনীর দুঃখের কথা কইয়ো বন্ধুরে।”

 

এমন আকুতি ভরা গানের কথাই কবি বলতে চেয়েছেন কলকল জলের ভাষায় তার প্রথম প্রেমের বিয়োগান্তক পরিণতির গল্পের মাধ্যমে। প্রথম প্রেম হারানোর যাতনা, স্বামীর অকাল প্রয়ানের বেদনা, সন্তানদের দূরত্ব, বয়সের ভার নিয়েও হতাশা নামক ব্যধি তাকে আজও গ্রাস করতে পারেনি। নিরাশার মাঝেও তিনি আশা জাগিয়ে রাখেন। মানুষের কথা বলেন। স্বপ্ন ও সুন্দরের কথা বলেন। ভালোবাসার আশ্রয় খোঁজেন কবিতায়। কাব্য প্রেমের আবেগে আপ্লুত হন বার বার। কবিতাই তার ধ্যান জ্ঞান প্রাণ। তার কবি হয়ে ওঠার পেছনে আরো একটি কারণের পাই সন্ধান এখানে এসে-
“কি দিবসে কি নিশিথে কান পেতে থাকি আমি/কোথাও কোনো নূপুর বাজে কিনা/
নীল বিকেল, সোনালি সন্ধ্যা কিংবা/ধূসর গোধূলি লগ্নে খুঁজে বেড়াই আমি/ নিবাস কোথায় এই কবিতার/ বসন্তের কৃষ্ণচূড়া, বর্ষার কদম/ তারাই আমাকে বলে লিখতে কবিতা।”
(কবিতাময় দেখি আমি এ পৃথিবী-আনন্দের কান্না গ্রন্থ)

অতি সরল জীবনের কবি হেনা রহমান। আকাশচুম্বী প্রাপ্তির প্রত্যাশা তার ছিলো না। ছিলো একটি মনুষ্য হৃদয় পাওয়ার দুরন্ত বাসনা। তাও জুটেনি তার ভাগ্যে। তাই খুব আক্ষেপের সুরে বলেছেন-
“আমি তো জানি ওগো/ মানুষের মন চায় মানুষেরই মন।/ অথৈ সমুদ্রবারি অফুরন্ত নির্ঝরের স্রোত/ পারে না ভরিতে তারা বিশাল মনুষ্য হৃদয়।”/ (উক্তি-অমরাবতী গ্রন্থ)

তার আক্ষেপটি আরও গাঢ় এবং গভীর হয়েছে এখানে এসে-
“জীবন গাঁথার ধাপে ধাপে প্রতিটি/ ইটের ভিতর কীট-পতঙ্গের বাস।/ আকাশচুম্বী প্রত্যাশা ছিলো না বলেই/ বিধাতার এমন বিদ্রুপ!”/ (অদৃশ্য থাবা-আনন্দের কান্না গ্রন্থ)

পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক কবির চোখে ধরা পড়েছে আকাশ আর ধ্রুবতারার সম্পর্কের রূপকীয় উপমায়। তিনি বলেন-
“আকাশের সাথে ধ্রুবতারার সখ্য নিয়ে/ প্রশ্ন করবে না কেউ/ জন্মলগ্ন থেকে ধ্রুবতারা তার বুকে জ্বলছে/ জ্বলবে সে আজীবন।/ যুগ যুগান্ত ধরে তোমরা আমরা/
হেঁটে চলেছি যে পথে/ সে পথের দীপশিখা চির অনির্বাণ/ জ্বলবে সে আজীবন।”/ (বাজলো সানাই-অমরাবতী গ্রন্থ)

যেহেতু তিনি নারী এবং মা সেহেতু মাতৃত্বের কোমলতা থেকে তিনি উপলব্ধি করেছেন, পারিবারিক সম্পর্কের শ্রেষ্ট সম্পর্ক মায়ের সাথে সন্তানের। তাই তিনি কবিতার শরীরে গেঁথে দিয়েছেন বাণী চিরন্তনী বাক্য-
“সম্পর্কের শ্রেষ্ট শব্দ এই পৃথিবীতে মা।” (সম্পর্কের শ্রেষ্ট যে শব্দটি-অমরাবতী কাব্যগ্রন্থ)।

মুক্তিযুদ্ধের কঠিন সময় পাড়ি দিয়ে এসে কবি দেখেছেন বিজয়। মহান মুক্তিযুদ্ধাদের জয়গান গেয়ে দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছেন কবি এভাবে-
“মহামিলনের ভোরে ওঠেছে নতুন সূর্য/ ঝলমলে তার রোদ/ আমার লেখনি আজ গাইতে চলেছে তাই তোমাদের জয়গান।/ জনতার ঢল রাস্তাতে, স্বপ্ন সাফল্যের জয়োল্লাস/ সহস্র কণ্ঠে একটি শব্দই শুধু/ জয় বাংলা, বাংলার জয়!/ (মুক্তিযুদ্ধ স্মরণে-অমরাবতী কাব্যগ্রন্থ)

আগেই বলেছি, কবির সৌন্দর্য চেতনা দেশ ও মৃত্তিকা নির্ভর। নিজে নারী হওয়ার পরও তার সৌন্দর্য চেতনায় নারীর চেয়ে নিসর্গের প্রতাপ লক্ষ্যণীয়। এখানে এসে তার প্রমাণ পেয়ে যাই-
“দেখার ইচ্ছা হয় কেবলই কিভাবে আছড়ে পড়ে/ উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ একটির পর আরেকটি।”
(আমি পাগল প্রকৃতির, নাকি প্রকৃতি পাগল-অমরাবতী গ্রন্থ)।

সুন্দরের মাঝেই কবি তার অস্তিত্বের সন্ধান পান।
“ভালোবাসার উৎস কোথায় যদি বলো/ খুঁজে দেখো-/ আমার ক্লান্তি নেই, আমি খুঁজবো/ তোমার আহবানে আমি/ সম্বিত ফিরে পাই/ দেখতে পাই, সুন্দরের মাঝেই আমার অস্তিত্ব।”/
(নন্দিনী-অমরাবতী গ্রন্থ)।
তাই কবি চার দেয়ালের পরিসীমাকে উপেক্ষা করে এসে দাঁড়ান খোলা আকাশের নিচে। প্রত্যক্ষ করেন নিসর্গের অনাবিল রূপমাধূর্য-
“ইচ্ছে করেই আমি চারদেয়ালের পরিসীমাকে/ উপেক্ষা করে/ এই খোলা আকাশের নিচে এসেছি।/ খেলা চলছে নীল সাদা শরতের পেঁজা তুলোর।/ উনমুক্ত আকাশ কী বিশাল পরিধি!”
(আমি খোলা আকাশের নিচে-অমরাবতী গ্রন্থ)।

সংগ্রাম মুখর জীবনের অনেক উত্থান পতনের মধ্যেও আনন্দের কান্না কাঁদতে পারেন কবি।
“অজস্র স্মৃতির ভীড়ে একটি চরিত্র আর একটি মন/ হৃদয়ের পদ্মপাতে দাগ কেটে যায়।”
(সুখ স্মৃতি-অমরাবতী গ্রন্থ)

কবি প্রথাগত জীবন থেকে বেরিয়ে এসে প্রকৃতির বিশাল ক্যানভাসে নিয়ত খুঁজেছেন নিজেকে। আত্মানুসন্ধানে সতত ব্যস্ত থেকে বিচরণ করেছেন মানব প্রকৃতির অন্তরতম প্রদেশে। নিজেকে আবিষ্কার করতে চেয়েছেন ভিন্ন ভাবে। কল্পনার গভীরতা ও লেখনীর কুশলতার ছাপ পাওয়া যায় কবির “ফিরে যাও পিছনে” নামক কাব্য গ্রন্থে। প্রকৃতিগত দিক দিয়ে মানুষ সামাজিক জীব হলেও প্রকৃত সত্য হলো, মানুষ একা শূন্য হাতে পৃথিবীতে আসে, আবার শূন্য হাতে একাই ফিরে যেতে হয় তার শেষ গন্তব্যে। উৎসব সমুখর ও কর্মব্যস্ত জীবনে স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয় পরিজন যতই থাকুক প্রতিটি মানুষই তার অন্তরতম প্রদেশে বড় একা। তাই কবি বলেন-
“ওই সবুজ ঘন নিবিড় বনের/ বৃক্ষ ডালের নীড়ে যে পাখি/ সে একা।/ পাহাড়ের পাদদেশে জন্ম হলো/ যে স্রোতস্বিনী/ সেও একা।/ যে দিকেই তাকাও উৎসব মুখর/ কর্মব্যস্ততার যে জগত/ তার অন্তরতম প্রদেশে তুমি বড্ড একা।” (তুমি একা- ফিরে যাও পিছনে গ্রন্থ)।

ঈশ্বর প্রেম, প্রকৃতি প্রেম, প্রাণি প্রেম, মানব প্রেম সকল কিছু প্রকাশের যুতসই মাধ্যম কবিতা। তাই কবির কাছে প্রেম বলতে কবিতাকেই বোঝায়।
“আমার জীবনে কি ছিলো অফুরান প্রেম প্রবাহ/ ছিলাম কি আমি প্রেমবৃত্তে বন্দী কোনোদিন?/
বরং প্রেমহীন মরুভূমিতে/ কেটেছে জীবনের আধেক কাল।/ নিঃশ্বাসে-বিশ্বাসে কষ্ট সে জীবন আমার।/ আমি বলি কবিতাই প্রেম/ কবিতা না থাকলে পৃথিবী হয়ে যেতো/ প্রেমহীন মরুভূমি।”
(কবিতাই প্রেম- ফিরে যাও পিছনে গ্রন্থ)।

নৈতিক অবক্ষয়ের নীল বিষ যখন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবহমান তখন মানবতার কবি হেনা রহমানের কন্ঠে ধ্বনিত হয় আত্মসুদ্ধির যুদ্ধতে আসার মানবিক আহবান।
“এসো যুদ্ধ করি/ অসির যুদ্ধ নয়, আত্মা সু্দ্ধির যুদ্ধ/ পাপ মুক্তির আকুল আবেদনে/ মানব বন্ধনে পথে নামি এসো।” (আত্মা সু্দ্ধির যুদ্ধতে এসো- ফিরে যাও পিছনে গ্রন্থ)।

কবি হেনা রহমান সমাজ সচেতন ও তীব্র অনুভূতিপ্রবণ কবি। তাই সমাজের নানা অবক্ষয়, অনিয়ম দেখে ব্যথিত হন। মানবতার অবমাননায় সীমান্তে ফালানী হত্যা তার কোমল অনুভূতিকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়ে যায়।
“মৃত্যুর কোনো শ্রেণিভেদ নেই/ মৃত্যু-মৃত্যুই/ সকল মৃত্যুর শোক কাতরতা এক তবে-/ চিত্ত বিচলিত কিছু মৃত্যু আছে/ যা চিত্তের মাঝে দাগ কেটে যায়।/ ফালানী নামটা ফেলে দেয়ার ইঙ্গিতে নয়/ ধরে নিলে হয়/ অতি আদরেই রেখেছিল বাবা-মা নামখানি তার।”
(ফালানীকে মনে পড়ে-আমি চাইনি বুট জুতার কঠোর শব্দ গ্রন্থ)।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তযুদ্ধে বাংলার বীর সেনানীদের বিজয়ের প্রাক্কালে ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর হাতে লুণ্ঠিত মানবতা বিশ্ব বিবেকে যখন চরম আঘাত করে তখনও কবির হৃদয়ের গভীরে মানবতা কেঁদে ওঠে। আজও তিনি বধ্য ভূমির দেয়ালে সে কান্নার শব্দ শুনতে পান।
“বিজয়ের মাটিতে আবার, ওঠেছি জেগে/ স্বাধীনতার সোপানে দাঁড়িয়ে রয়েছি বটে/ তবু হৃদয়ের গভীরে কাঁদে মানবতা/ বধ্য ভূমির দেয়ালে নিশুতি রাতে/ সেই কান্নার প্রতিধ্বনি আমি শুনতে পাই।” (কাঁদে মানবতা-অমরাবতী গ্রন্থ)।

কবি কবি হেনা রহমান তার নিজের অমরাবতী ভুবন রচনা করতে না পারলেও নানা উপমা উৎপ্রেক্ষা ও রূপকের সংমিশ্রণে আমাদের দিয়ে গেছেন কবিতার অমরাবতী ভুবনের সন্ধান। সাজিয়েছেন তার নন্দিত কাব্যোদ্যান। কবিতার ত্রি-বৃত্তীয় ছন্দ পুরোপুরি অনুসরন না করা হলেও অমরাবতীয় ইন্দ্রজালিক কাব্য ভুবন সৃষ্টিতে তিনি সক্ষম হয়েছেন কল্পনার গভীরতা আর শব্দ প্রয়োগের কুশলতায়। সহজ সরল আধুনিক শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি কবিতার ছন্দময়তাকে পৌঁছে দিয়েছেন পাঠকের অন্তরতম প্রদেশে।

পরিবেশের সৌন্দর্য বর্ধনে রোপিত বৃক্ষাদির ডালপালা ছেঁটে দিলে যেমন তৈরি হয় শোভিত নন্দন কানন তেমনি কবিতার প্রসঙ্গাতীত এবং ভাবের সাথে সঙ্গতিহীন শব্দাবলীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে সৃষ্টি হয় দৃষ্টি নন্দন ও শ্রুতিমধুর কাব্যোদ্যান। এ বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি দিয়ে কবি ভবিষ্যতে আরও সুন্দর করে সাজাবেন তার কবিতা কানন এই প্রত্যাশা রইলো কবির কাছে।

প্রিয় কবি, আপনার সাফল্য এবং সুস্বাস্থ্যময় দীর্ঘ জীবন কামনা করছি। বিপ্লুত ইচ্ছার উচ্ছ্বাসে আপনার কলম চলুক দুর্নিবার, কবিতা হোক সমাজ পরিবর্তনের অনন্য হাতিয়ার।

 

মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান
গবেষণা ও মূল্যায়ন সম্পাদক
অনুপ্রাস জাতীয় কবি সংগঠন।

 

 

সংবাদটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে শেয়ার করুন

সর্বশেষ আপডেট



» কলাপাড়ায় রান্নার চুলা ভাঙ্গার প্রতিবাদ করায় গৃহবধুকে নির্যাতন

» নওগাঁর আত্রাই ২নং ভোঁ-পাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিকী কাউন্সিল অধিবেশন-২০১৯

» ঝিনাইদহ ইসলামিক ফাউন্ডশেনের আয়োজনে ঈদে মিলাদুন্নবী পালিত

» ঝিনাইদহে তারেক রহমানের জন্ম-বাষিকী উপলক্ষে আলোচনা ও দোয়া মাহফিল

» ঝিনাইদহে তৃতীয় দিনের মত চলছে পরিবহণ ধর্মঘট, যাত্রীরা পড়ছেন মহা দুর্ভগে

» মহেশপুর সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে ঢুকছে এরা কারা?

» দুই হাত ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে ফাল্গুনী আজ অফিসার

» সুফিয়া কামালের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা নিবেদন ও আলোচনা সভা করেছে বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট

» কলাপাড়ায় চার ব্যবসায়ীকে জরিমানা

» কলাপাড়ায় আয়কর মেলার উদ্বোধন

লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন

ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মো: আবুল কালাম আজাদ, খোকন
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : কামাল হোসেন খান
সম্পাদক : এডভোকেট মো: ফেরদৌস খান
বার্তা সম্পাদক : মো: সো‌হেল অাহ‌ম্মেদ
সহ-সম্পাদক : নুরুজ্জামান কাফি
মফস্বল বিভাগ প্রধান: উত্তম কুমার হাওলাদার
যোগাযোগ: বাড়ী- ৫০৬/এ, রোড- ৩৫,
মহাখালী, ডি ও এইচ এস, ঢাকা- ১২০৬,
ফোন: +৮৮ ০১৭৩১ ৬০০ ১৯৯, ৯৮৯১৮২৫,
বার্তা এবং বিজ্ঞাপন : + ৮৮ ০১৬৭৪ ৬৩২ ৫০৯।
বিজ্ঞাপন এবং নিউজ : + ৮৮ ০১৭১৬ ৮৯২ ৯৭০।
News: editor.kuakatanews@gmail.com
Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
আজ শনিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ, ৮ই অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

কবি হেনা রহমান ও তার কাব্যোদ্যান

ইউটিউবে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

কবি হেনা রহমানের জন্ম ১৯৪৮ সালের ১ জানুয়ারি পশ্চিম বঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার বারাকপুরে। ২ বৎসর বয়সে তিনি সপরিবারে তৎকালীন পূর্ব বাংলা অর্থৎ বর্তমান বাংলাদেশে চলে আসেন এবং এই বয়সেই তার পিতৃবিয়োগ ঘটে। জীবনের প্রতি পদক্ষেপে প্রতিকুলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে ১৯৬৩ সালে তিনি তেজগাঁও পলিটেকনিক গার্লস হাইস্কুল হতে এস এস সি এবং ১৯৬৮ সালে ইডেন মহিলা মহাবিদ্যালয় হতে বিএ পাস করেন।

 

যুগলবন্দি জীবনের ৪০ বছর অতিক্রান্তের পর তার স্বামী না ফেরার দেশে চলে যান। কবির ২ পুত্র এবং ২ কন্যা সন্তানের সবাই প্রতিষ্ঠিত এবং যার যার সংসারে ব্যস্ত। নিঃসঙ্গ জীবনে বই-ই তার একমাত্র বিশ্বস্ত সঙ্গী।

 

শৈশবে বই পড়ার দুর্বার আকর্ষণই তাকে মননশীল সাহিত্য জগতের সন্ধান দেয়। আত্মনিয়োগ করেন কবিতা লেখায়। নিজের জীবন থেকে উপলব্ধি করেন পারিপার্শ্বিক জীবনের সুখ দুখ, হাসি কান্না। প্রকৃতির উদার ও অনিন্দ্যসুন্দর লাবণ্যসুধাও হৃদয়ের ক্যানভাসে ধারণ করেন তৈলচিত্রের উপমায়। সমাজের নানা অসঙ্গতিও উপলব্ধি করেন গভীর দৃষ্টি প্রক্ষেপণের মাধ্যমে। আর কাব্যের শরীর নির্মাণ করতে থাকেন এসব বিচিত্র উপাদানের সমন্বয়ে। প্রেম, প্রতিবাদ, সাম্যবাদ, জীবন সংগ্রাম, আদর্শবাদিতা, মানবধর্মিতা, সমাজ চেতনা, মাতৃত্বের কোমলতা, স্বদেশ প্রেম তার কবিতার প্রধান উপজীব্য বিষয়। কবির সৌন্দর্য চেতনা দেশ ও মৃত্তিকা নির্ভর। নিজে নারী হওয়ার পরও তার সৌন্দর্য চেতনায় নারীর চেয়ে নিসর্গের প্রতাপ লক্ষ্যণীয়।

 

কবি হেনা রহমান নিভৃতচারী এক আধুনিক কবি। মারাত্মক ব্রেনস্ট্রোক করে ফিরে আসেন মৃত্যুর দুয়ার হতে। কিন্তু মুখ ফিরাতে পারেননি কবিতার জগত থেকে। এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত কাব্য গ্রন্থের সংখ্যা ৪টি, (১। অমরাবতী-প্রকাশকাল, একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৪), (২। আনন্দের কান্না-প্রকাশকাল, একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৫), (৩। আমি চাইনি বুট জুতার কঠোর শব্দ-প্রকাশকাল, একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৭), (৪। ফিরে যাও পিছনে-প্রকাশকাল, একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৮)। এখনও তিনি সমাজ ও সভ্যতার অসঙ্গতি কাব্যিক ভাষাদানের মাধ্যমে সমাজ সংস্কারের ভূমিকায় অগ্রণী সৈনিকের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। নিঃসঙ্গ সময় কাটাচ্ছেন লেখালেখি আর সাংস্কৃতিক সংগঠনে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে। বর্তমানে তিনি অনুপ্রাস জাতীয় কবি সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য।

 

অস্থির সময়ে সুস্থির কবি হেনা রহমান খুব সহজেই সকলের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হন তার শান্তশিষ্ট মার্জিত আচরণের মাধ্যমে। ভদ্র, বিনয়ী, স্থিতধী, মিতভাষী কবির সংযত বচন ও ব্যবহারের ভিতর থেকে তার চরিত্রের সরলতা এবং উদারতা স্বতঃধারায় প্রকাশিত।

 

কর্ণফুলি নদীর তীরে মনোরম প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা কবি পান অমরাবতীর সন্ধান। কিন্তু সেখানে ঠাঁই হয়নি তার। চক্ষুসরোবরে প্লাবিত বেদনার জল কর্ণফুলির স্বচ্ছ জলে ঢেলে দিয়ে স্বপ্নের আপন অমরাবতী ভুবন রচনা করতে গিয়েও হলো না রচনা। আর অষ্টাদশী যুবতির প্রথম প্রেমের ইন্দ্রনীলে হানা দেয় দুর্জয় জলোচ্ছ্বাস। ভালোবাসার শুকপাখি অন্তরে বাসা বাঁধার আগেই হয় জলস্রোতে বিলীন। “সাজানো বাসর, গ্রথিত ফুলের মালা/নিমেষে দুপায়ে দলে চলে গেল/নির্দয় নিষ্ঠুর পদক্ষেপে/দোতলার সবগুলো সিঁড়ি বেয়ে/আমার হৃদয়সমুদ্রে তখন বিক্ষুব্ধ ঝড়!” (পরাজয়-অমরাবতী গ্রন্থ) সেই ঝড়ে ঘর গেল, পর হলো আপন মানুষ, হারালো নীড়ের ঠিকানা। চেনা জানা সব মানুষ হয়ে গেল অচেনা। পরাজয়ের অতল অন্ধকারে হারিয়ে গেলো জীবনের চেনা পথ। তার পর শুধু বেঁচে থাকা। “আমার প্রথম প্রেম/অষ্টাদশী যখন আমি/মরা পাতার মতো ঝরে গেল/পরবর্তীতে যাকে ভালোবাসবো/তাকেও পাইনি খুঁজে আর…”(আমার প্রথম প্রেম-আনন্দের কান্না গ্রন্থ) কবির হৃদয়ে বাসা বাঁধলো প্রথম প্রেম হারানোর হাহাকার! প্রথম প্রেম হারানোর বেদনাই হয়তো তার ভিতরে কবিসত্তার জন্ম দিয়েছে। যেমন দিয়েছিলো নার্গিস কবি নজরুল ইসলামকে। হারানো প্রেমের দুঃসহ বেদনার চিত্র ফুটে ওঠে বিভিন্ন লোক গানে। “কর্ণফুলি রে সাক্ষী রাখিলাম তোরে/অভাগিনীর দুঃখের কথা কইয়ো বন্ধুরে।”

 

এমন আকুতি ভরা গানের কথাই কবি বলতে চেয়েছেন কলকল জলের ভাষায় তার প্রথম প্রেমের বিয়োগান্তক পরিণতির গল্পের মাধ্যমে। প্রথম প্রেম হারানোর যাতনা, স্বামীর অকাল প্রয়ানের বেদনা, সন্তানদের দূরত্ব, বয়সের ভার নিয়েও হতাশা নামক ব্যধি তাকে আজও গ্রাস করতে পারেনি। নিরাশার মাঝেও তিনি আশা জাগিয়ে রাখেন। মানুষের কথা বলেন। স্বপ্ন ও সুন্দরের কথা বলেন। ভালোবাসার আশ্রয় খোঁজেন কবিতায়। কাব্য প্রেমের আবেগে আপ্লুত হন বার বার। কবিতাই তার ধ্যান জ্ঞান প্রাণ। তার কবি হয়ে ওঠার পেছনে আরো একটি কারণের পাই সন্ধান এখানে এসে-
“কি দিবসে কি নিশিথে কান পেতে থাকি আমি/কোথাও কোনো নূপুর বাজে কিনা/
নীল বিকেল, সোনালি সন্ধ্যা কিংবা/ধূসর গোধূলি লগ্নে খুঁজে বেড়াই আমি/ নিবাস কোথায় এই কবিতার/ বসন্তের কৃষ্ণচূড়া, বর্ষার কদম/ তারাই আমাকে বলে লিখতে কবিতা।”
(কবিতাময় দেখি আমি এ পৃথিবী-আনন্দের কান্না গ্রন্থ)

অতি সরল জীবনের কবি হেনা রহমান। আকাশচুম্বী প্রাপ্তির প্রত্যাশা তার ছিলো না। ছিলো একটি মনুষ্য হৃদয় পাওয়ার দুরন্ত বাসনা। তাও জুটেনি তার ভাগ্যে। তাই খুব আক্ষেপের সুরে বলেছেন-
“আমি তো জানি ওগো/ মানুষের মন চায় মানুষেরই মন।/ অথৈ সমুদ্রবারি অফুরন্ত নির্ঝরের স্রোত/ পারে না ভরিতে তারা বিশাল মনুষ্য হৃদয়।”/ (উক্তি-অমরাবতী গ্রন্থ)

তার আক্ষেপটি আরও গাঢ় এবং গভীর হয়েছে এখানে এসে-
“জীবন গাঁথার ধাপে ধাপে প্রতিটি/ ইটের ভিতর কীট-পতঙ্গের বাস।/ আকাশচুম্বী প্রত্যাশা ছিলো না বলেই/ বিধাতার এমন বিদ্রুপ!”/ (অদৃশ্য থাবা-আনন্দের কান্না গ্রন্থ)

পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক কবির চোখে ধরা পড়েছে আকাশ আর ধ্রুবতারার সম্পর্কের রূপকীয় উপমায়। তিনি বলেন-
“আকাশের সাথে ধ্রুবতারার সখ্য নিয়ে/ প্রশ্ন করবে না কেউ/ জন্মলগ্ন থেকে ধ্রুবতারা তার বুকে জ্বলছে/ জ্বলবে সে আজীবন।/ যুগ যুগান্ত ধরে তোমরা আমরা/
হেঁটে চলেছি যে পথে/ সে পথের দীপশিখা চির অনির্বাণ/ জ্বলবে সে আজীবন।”/ (বাজলো সানাই-অমরাবতী গ্রন্থ)

যেহেতু তিনি নারী এবং মা সেহেতু মাতৃত্বের কোমলতা থেকে তিনি উপলব্ধি করেছেন, পারিবারিক সম্পর্কের শ্রেষ্ট সম্পর্ক মায়ের সাথে সন্তানের। তাই তিনি কবিতার শরীরে গেঁথে দিয়েছেন বাণী চিরন্তনী বাক্য-
“সম্পর্কের শ্রেষ্ট শব্দ এই পৃথিবীতে মা।” (সম্পর্কের শ্রেষ্ট যে শব্দটি-অমরাবতী কাব্যগ্রন্থ)।

মুক্তিযুদ্ধের কঠিন সময় পাড়ি দিয়ে এসে কবি দেখেছেন বিজয়। মহান মুক্তিযুদ্ধাদের জয়গান গেয়ে দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছেন কবি এভাবে-
“মহামিলনের ভোরে ওঠেছে নতুন সূর্য/ ঝলমলে তার রোদ/ আমার লেখনি আজ গাইতে চলেছে তাই তোমাদের জয়গান।/ জনতার ঢল রাস্তাতে, স্বপ্ন সাফল্যের জয়োল্লাস/ সহস্র কণ্ঠে একটি শব্দই শুধু/ জয় বাংলা, বাংলার জয়!/ (মুক্তিযুদ্ধ স্মরণে-অমরাবতী কাব্যগ্রন্থ)

আগেই বলেছি, কবির সৌন্দর্য চেতনা দেশ ও মৃত্তিকা নির্ভর। নিজে নারী হওয়ার পরও তার সৌন্দর্য চেতনায় নারীর চেয়ে নিসর্গের প্রতাপ লক্ষ্যণীয়। এখানে এসে তার প্রমাণ পেয়ে যাই-
“দেখার ইচ্ছা হয় কেবলই কিভাবে আছড়ে পড়ে/ উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ একটির পর আরেকটি।”
(আমি পাগল প্রকৃতির, নাকি প্রকৃতি পাগল-অমরাবতী গ্রন্থ)।

সুন্দরের মাঝেই কবি তার অস্তিত্বের সন্ধান পান।
“ভালোবাসার উৎস কোথায় যদি বলো/ খুঁজে দেখো-/ আমার ক্লান্তি নেই, আমি খুঁজবো/ তোমার আহবানে আমি/ সম্বিত ফিরে পাই/ দেখতে পাই, সুন্দরের মাঝেই আমার অস্তিত্ব।”/
(নন্দিনী-অমরাবতী গ্রন্থ)।
তাই কবি চার দেয়ালের পরিসীমাকে উপেক্ষা করে এসে দাঁড়ান খোলা আকাশের নিচে। প্রত্যক্ষ করেন নিসর্গের অনাবিল রূপমাধূর্য-
“ইচ্ছে করেই আমি চারদেয়ালের পরিসীমাকে/ উপেক্ষা করে/ এই খোলা আকাশের নিচে এসেছি।/ খেলা চলছে নীল সাদা শরতের পেঁজা তুলোর।/ উনমুক্ত আকাশ কী বিশাল পরিধি!”
(আমি খোলা আকাশের নিচে-অমরাবতী গ্রন্থ)।

সংগ্রাম মুখর জীবনের অনেক উত্থান পতনের মধ্যেও আনন্দের কান্না কাঁদতে পারেন কবি।
“অজস্র স্মৃতির ভীড়ে একটি চরিত্র আর একটি মন/ হৃদয়ের পদ্মপাতে দাগ কেটে যায়।”
(সুখ স্মৃতি-অমরাবতী গ্রন্থ)

কবি প্রথাগত জীবন থেকে বেরিয়ে এসে প্রকৃতির বিশাল ক্যানভাসে নিয়ত খুঁজেছেন নিজেকে। আত্মানুসন্ধানে সতত ব্যস্ত থেকে বিচরণ করেছেন মানব প্রকৃতির অন্তরতম প্রদেশে। নিজেকে আবিষ্কার করতে চেয়েছেন ভিন্ন ভাবে। কল্পনার গভীরতা ও লেখনীর কুশলতার ছাপ পাওয়া যায় কবির “ফিরে যাও পিছনে” নামক কাব্য গ্রন্থে। প্রকৃতিগত দিক দিয়ে মানুষ সামাজিক জীব হলেও প্রকৃত সত্য হলো, মানুষ একা শূন্য হাতে পৃথিবীতে আসে, আবার শূন্য হাতে একাই ফিরে যেতে হয় তার শেষ গন্তব্যে। উৎসব সমুখর ও কর্মব্যস্ত জীবনে স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয় পরিজন যতই থাকুক প্রতিটি মানুষই তার অন্তরতম প্রদেশে বড় একা। তাই কবি বলেন-
“ওই সবুজ ঘন নিবিড় বনের/ বৃক্ষ ডালের নীড়ে যে পাখি/ সে একা।/ পাহাড়ের পাদদেশে জন্ম হলো/ যে স্রোতস্বিনী/ সেও একা।/ যে দিকেই তাকাও উৎসব মুখর/ কর্মব্যস্ততার যে জগত/ তার অন্তরতম প্রদেশে তুমি বড্ড একা।” (তুমি একা- ফিরে যাও পিছনে গ্রন্থ)।

ঈশ্বর প্রেম, প্রকৃতি প্রেম, প্রাণি প্রেম, মানব প্রেম সকল কিছু প্রকাশের যুতসই মাধ্যম কবিতা। তাই কবির কাছে প্রেম বলতে কবিতাকেই বোঝায়।
“আমার জীবনে কি ছিলো অফুরান প্রেম প্রবাহ/ ছিলাম কি আমি প্রেমবৃত্তে বন্দী কোনোদিন?/
বরং প্রেমহীন মরুভূমিতে/ কেটেছে জীবনের আধেক কাল।/ নিঃশ্বাসে-বিশ্বাসে কষ্ট সে জীবন আমার।/ আমি বলি কবিতাই প্রেম/ কবিতা না থাকলে পৃথিবী হয়ে যেতো/ প্রেমহীন মরুভূমি।”
(কবিতাই প্রেম- ফিরে যাও পিছনে গ্রন্থ)।

নৈতিক অবক্ষয়ের নীল বিষ যখন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবহমান তখন মানবতার কবি হেনা রহমানের কন্ঠে ধ্বনিত হয় আত্মসুদ্ধির যুদ্ধতে আসার মানবিক আহবান।
“এসো যুদ্ধ করি/ অসির যুদ্ধ নয়, আত্মা সু্দ্ধির যুদ্ধ/ পাপ মুক্তির আকুল আবেদনে/ মানব বন্ধনে পথে নামি এসো।” (আত্মা সু্দ্ধির যুদ্ধতে এসো- ফিরে যাও পিছনে গ্রন্থ)।

কবি হেনা রহমান সমাজ সচেতন ও তীব্র অনুভূতিপ্রবণ কবি। তাই সমাজের নানা অবক্ষয়, অনিয়ম দেখে ব্যথিত হন। মানবতার অবমাননায় সীমান্তে ফালানী হত্যা তার কোমল অনুভূতিকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়ে যায়।
“মৃত্যুর কোনো শ্রেণিভেদ নেই/ মৃত্যু-মৃত্যুই/ সকল মৃত্যুর শোক কাতরতা এক তবে-/ চিত্ত বিচলিত কিছু মৃত্যু আছে/ যা চিত্তের মাঝে দাগ কেটে যায়।/ ফালানী নামটা ফেলে দেয়ার ইঙ্গিতে নয়/ ধরে নিলে হয়/ অতি আদরেই রেখেছিল বাবা-মা নামখানি তার।”
(ফালানীকে মনে পড়ে-আমি চাইনি বুট জুতার কঠোর শব্দ গ্রন্থ)।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তযুদ্ধে বাংলার বীর সেনানীদের বিজয়ের প্রাক্কালে ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর হাতে লুণ্ঠিত মানবতা বিশ্ব বিবেকে যখন চরম আঘাত করে তখনও কবির হৃদয়ের গভীরে মানবতা কেঁদে ওঠে। আজও তিনি বধ্য ভূমির দেয়ালে সে কান্নার শব্দ শুনতে পান।
“বিজয়ের মাটিতে আবার, ওঠেছি জেগে/ স্বাধীনতার সোপানে দাঁড়িয়ে রয়েছি বটে/ তবু হৃদয়ের গভীরে কাঁদে মানবতা/ বধ্য ভূমির দেয়ালে নিশুতি রাতে/ সেই কান্নার প্রতিধ্বনি আমি শুনতে পাই।” (কাঁদে মানবতা-অমরাবতী গ্রন্থ)।

কবি কবি হেনা রহমান তার নিজের অমরাবতী ভুবন রচনা করতে না পারলেও নানা উপমা উৎপ্রেক্ষা ও রূপকের সংমিশ্রণে আমাদের দিয়ে গেছেন কবিতার অমরাবতী ভুবনের সন্ধান। সাজিয়েছেন তার নন্দিত কাব্যোদ্যান। কবিতার ত্রি-বৃত্তীয় ছন্দ পুরোপুরি অনুসরন না করা হলেও অমরাবতীয় ইন্দ্রজালিক কাব্য ভুবন সৃষ্টিতে তিনি সক্ষম হয়েছেন কল্পনার গভীরতা আর শব্দ প্রয়োগের কুশলতায়। সহজ সরল আধুনিক শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি কবিতার ছন্দময়তাকে পৌঁছে দিয়েছেন পাঠকের অন্তরতম প্রদেশে।

পরিবেশের সৌন্দর্য বর্ধনে রোপিত বৃক্ষাদির ডালপালা ছেঁটে দিলে যেমন তৈরি হয় শোভিত নন্দন কানন তেমনি কবিতার প্রসঙ্গাতীত এবং ভাবের সাথে সঙ্গতিহীন শব্দাবলীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে সৃষ্টি হয় দৃষ্টি নন্দন ও শ্রুতিমধুর কাব্যোদ্যান। এ বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি দিয়ে কবি ভবিষ্যতে আরও সুন্দর করে সাজাবেন তার কবিতা কানন এই প্রত্যাশা রইলো কবির কাছে।

প্রিয় কবি, আপনার সাফল্য এবং সুস্বাস্থ্যময় দীর্ঘ জীবন কামনা করছি। বিপ্লুত ইচ্ছার উচ্ছ্বাসে আপনার কলম চলুক দুর্নিবার, কবিতা হোক সমাজ পরিবর্তনের অনন্য হাতিয়ার।

 

মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান
গবেষণা ও মূল্যায়ন সম্পাদক
অনুপ্রাস জাতীয় কবি সংগঠন।

 

 

সংবাদটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে শেয়ার করুন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



Click Here

সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



About Us | Privacy Policy | Terms & Conditions | Contact Us | Sitemap
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মো: আবুল কালাম আজাদ, খোকন
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : কামাল হোসেন খান
সম্পাদক : এডভোকেট মো: ফেরদৌস খান
বার্তা সম্পাদক : মো: সো‌হেল অাহ‌ম্মেদ
সহ-সম্পাদক : নুরুজ্জামান কাফি
মফস্বল বিভাগ প্রধান: উত্তম কুমার হাওলাদার
যোগাযোগ: বাড়ী- ৫০৬/এ, রোড- ৩৫,
মহাখালী, ডি ও এইচ এস, ঢাকা- ১২০৬,
ফোন: +৮৮ ০১৭৩১ ৬০০ ১৯৯, ৯৮৯১৮২৫,
বার্তা এবং বিজ্ঞাপন : + ৮৮ ০১৬৭৪ ৬৩২ ৫০৯।
বিজ্ঞাপন এবং নিউজ : + ৮৮ ০১৭১৬ ৮৯২ ৯৭০।
News: editor.kuakatanews@gmail.com

© Copyright BY KuakataNews.Com

Design & Developed BY PopularITLimited