উত্তর জনপদের বড়াল নদী অস্তিত্ব সংকটে মৃত প্রায়

Spread the love

বাকী বিল্লাহ পাবনা: উত্তর জনপদের অন্যতম নদী বড়াল। যা এখন মৃতপ্রায়।পদ্মা এবং যমুনা নদীর সংযোগ রক্ষাকারী বড়াল নদীর দৈর্ঘ্য দুইশত চার কিলোমিটার। রাজশাহীর চারঘাটে পদ্মা নদী এর উৎসস্থল। রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে যমুনায় মিশেছে পাবনার বেড়া উপজেলার কাছে। বড়াল হচ্ছে চলন বিলের প্রধান নদী। বড় থেকে বড়াল শব্দটির উৎপত্তি। এই এলাকার সবচেয়ে বড় নদী হেতু এই নামকরণ করা হয়েছে। বড়ালকে ‘বড়হর’ অর্থাৎ পদ্মার বড় হাওরও বলা হয়ে থাকে।পদ্মা এবং যমুনার পানি যখন বাড়ে বা কমে বড়াল নদী হয়ে সেই পানি প্রবেশ করে চলন বিলে। এতে বিল চালু থাকে। সে কারণেই বিলটির নাম ‘চলন’।

 

এই বিলের পানি সর্বদাই চলমান। চলনবিলের অভ্যন্তরে শত শত ছোট-বড় বিল ও খাল রয়েছে। এসব খাল প্রাকৃতিক। আবার বিল থেকেও ছোট নদীর উৎপত্তি হয়েছে। নদী থেকে খালও হয়েছে। এক কথায় বলা যায় চলন বিল হচ্ছে অসংখ্য স্রোতের জাল। আর এই জালের প্রধান সূত্র হচ্ছে বড়াল নদী। এ নদী থেকে আরও ৯টি নদীর উৎপত্তি হয়েছে। সেগুলো থেকে সৃষ্টি হয়েছে আরও প্রায় শতাধিক নালা বা খাল। বড়ালের মৃত্যুর কারণে মরে গেছে ছোট ছোট নদী, খাল ও চলনবিল। বড়াল মৃতপ্রায় তাই দেশের সর্ববৃহৎ বিল চলনে এখন শুকনা মৌসুমে পানি থাকে না। সে কারণে মাছের ভারও এখন প্রায় শূন্য।বড়ালকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। রাজশাহীর চারঘাট থেকে জন্ম নিয়ে নদীটি নাটোরের গুরুদাসপুরের কাছে আত্রাই নদীর সাথে মিলেছে। এই অংশকে বড়াল আপার বলা হয়। এই অংশের দৈর্ঘ্য ৮৪ কিলোমিটার। আর বড়াইগ্রামের আটঘড়ি থেকে বেরিয়ে বনপাড়া, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, সাঁথিয়া হয়ে শাহজাদপুরের বাঘাবাড়ি ঘাটের কাছে হুরাসাগর নদী হয়ে যমুনায় মিলিত হয়েছে, এই অংশ লোয়ার বড়াল। আপার বড়াল এর দৈর্ঘ্য ১২০ কিলোমিটার। গড় প্রস্থ ১২০ মিটার, গড় গভীরতা ৯ দশমিক ৯০ মিটার। ৭৭২ বর্গমিটার হচ্ছে নদীটির অববাহিকা। লোয়ার বড়াল এর গড় প্রস্থ ৬০ মিটার, গভীরতা ৫ মিটার ও অববাহিকা ৭৭০ বর্গ কিলোমিটার। মুসা খাঁ এবং নন্দকুঁজা বড়ালের দুটি শাখা নদী। মুসা খাঁ নদীর উৎপত্তি নাটোরের বাগাতিপাড়া হাপানিয়ায়। পাইকপাড়া গিয়ে মুসা খাঁ নদী থেকে উৎপত্তি হয়েছে নারোদ নদীর। এই নদীটি নন্দকুঁজা নদী হয়ে আত্রাই নদীতে মিশেছে। নারোদ নদী তীরেই আত্রাই উপজেলার পতিসরের রবীন্দ্র কাছারি বাড়ি। এই নদীকে নিয়েই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেছেন ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে …।’

 

বড়াল এর আর একটি শাখা নন্দকুঁজার উৎপত্তি নাটোরের আটঘড়ি থেকে। নদীটি নাটোর হয়ে গুরুদাসপুরের চাঁচকৈর নামক স্থানে আত্রাই নদীর সঙ্গে মিশেছে। নন্দকুঁজা এবং আত্রাই এর মিলন স্থল থেকে গুমানী নাম ধারণ করে চাটমোহরের নুন নগরে এসে বড়ালে মিশে আবার বড়াল নামেই বাঘাবাড়ি চলে গেছে। সেখানে করতোয়া, হুরাসাগর এবং বড়াল মিশে অগ্রসর হয়েছে যমুনায়।বড়াল নদীর এই দূরাবস্থার জন্য দায়ী কে? এক কথায় এলাকাবাসী বা বড়াল পাড়ের মানুষজন বলে থাকেন এর জন্য দায়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদী, পানি ও বন্যা বিষয়ক কিছু ভুল নীতি।পানি উন্নয়ন বোর্ড পাকিস্তান আমলে তৈরি হয়েছিল বন্যা প্রশমন বা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। ‘বন্যা নিয়ন্ত্রণ’ পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের ধারণা। এর মূল হচ্ছে বেগবান নদীকে বাঁধ দিয়ে তার প্রবাহ আটকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা। এই পদ্ধতিকে বলা হয় অবরোধ পন্থা বা ‘কর্ডন অ্যাপ্রোচ’। আধুনিক ধারণা তার উল্টো। তাতে বলা হচ্ছে, বন্যা নিয়ন্ত্রণ করার বিষয় নয়, প্রয়োজনও নেই।

 

সামগ্রিক বিচারে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করে কোন লাভ নেই। বাঁধ বসিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় পানি প্রবেশ রোধ করা যায়। তবে সেই বদ্ধ বা বিতাড়িত পানি নিকটবর্তী বা দূরবর্তী অন্য কোন স্থানে নদীর পাড় ভাঙবে বা আরেক এলাকা প্লাবিত করবে। নতুন এলাকায় বন্যার সূত্রপাত করবে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ হয় না, স্থানান্তর হয় মাত্র।বড়ালের স্বাভাবিক পানি চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই এলাকার প্রসিদ্ধ নদী বন্দরসমূহ মরে গেছে। চারঘাট, পুঠিয়া, বাগাতিপাড়া, দয়ারামপুর ক্যান্টনমেন্ট, বড়াইগ্রাম, বনপাড়া, রামনগর, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, মির্জাপুর, জোনাইল, বাঘা, ডেমড়া, সিলন্দা ইত্যাদি নদী বন্দর এখন মৃতপ্রায়।এই বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতেই পানি উন্নয়ন বোর্ড বড়াল বেসিন ডেভলপমেন্ট প্রজেক্টের আওতায় ১৯৮৫ সালে চারঘাটে বড়াল নদীর উৎসমুখে নির্মাণ করে ক্লোজার বা তিন দরজা বিশিষ্ট স্লইস গেইট। পদ্মা নদী থেকে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেয়া বড়াল নদী’র স্বাভাবিক গতিপথ বন্ধ করা হয় ১৯৯৫-৯৬ সালে নাটোরের আটঘড়ি নামক স্থানে আরও একটি পাঁচ দরজা বিশিষ্ট স্লুইস গেইট নির্মাণ করে। এই গেইটটি নির্মাণ করার ফলে দক্ষিণ দিকের অংশে পানি থাকলেও উত্তরের অংশে পানি চলাচল একবারেই বন্ধ হয়ে যায়।

 

এখানেই বড়ালের মুখে নির্মাণ করা হয় এক দরজা বিশিষ্ট একটি স্লুইস গেইট। একদিকে বড়ালের উৎসমুখে চারঘাটে স্লুইস গেইট, অন্যদিকে দীর্ঘদিন এত বড় একটি নদীর মুখে এক দরজার একটি স্লুইস গেইট নির্মাণ করায় বনপাড়া পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকায় নদী অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে। নদীর ভাটিতে বড়াল নদীর উপর তৃতীয় ও চতুর্থ স্লুইস গেইট নির্মাণ করা হয় ভাঙ্গুড়া এবং চাটমোহরের দহপাড়ার নিকটে। দহপাড়ার নিকটবর্তী স্লুইস গেইটটির উভয় পার্শ্বই শুকিয়ে যায় শুকনো মৌসুমে। যেহেতু নদীটিকে এভাবে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। অতএব এর পর যা হওয়ার তাই হয়েছে। যে যেখানে যতটুকু পারে নদী দখল করেছে। নদীর মধ্যে ঘর-বাড়ি, দোকান-গুদাম উঠিয়েছে। নদীর মধ্যে চাষাবাদ করা হচ্ছে। কোন কোন এলাকায় নদীতে আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে নদীর পানি চলাচল বন্ধ করে দিয়ে মাছ চাষ করছে।

 

বড়াল অববাহিকার ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। আশি’র দশক পর্যন্ত বড়াল ছিল স্থানীয় যোগাযোগ ও বাণিজ্যের চালিকাশক্তি তেমনি ছিল সংস্কৃতি ও বিনোদনের প্রাণকেন্দ্র। এই অঞ্চলের শতকরা নব্বইভাগ অধিবাসীই ছিল বড়াল নদীর উপর নির্ভরশীল। চারঘাটে স্লুইস গেইট নির্মাণ করার ফলে নদী সংকুচিত হতে থাকে, পানি প্রবাহ হ্রাস পায়। এর ফলে পরিবর্তিত হতে থাকে পরিবেশ ও বড়াল পাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকা। বড়াল অববাহিকার অর্থনীতি মূলত কৃষি, মৎস্য ও গবাদি পশুসম্পদ নির্ভর। ধান, চাল, মসুর, খেসারি, সরিষা, মাস কালাই প্রভৃতি উৎপাদনের জন্য বড়াল অববাহিকার সুখ্যাতি ছিল। স্থানীয় ভাষায় এগুলোকে বলা হয় ভুষালি ফসল। নৌপথে বড়াল পাড়ের ফসল যেতো চাঁদপুর, চট্টগাম, ঢাকা, নারয়ণগঞ্জ ও খুলনায়।

 

আশির দশকের শুরুর দিকেও বড় বড় নৌকা, বার্জ, কার্গোতে পণ্য সামগ্রী আনা-নেয়া হতো বড়াল নদী পথে। চলতো বড় বড় লঞ্চ ও স্টিমার। আমরা ছোট সময়ে গল্প শুনতাম আমার মুরব্বিদের কাছ থেকে ষাটের দশকে স্টিমার ও লঞ্চে বিভিন্ন যায়গা যাতায়াত করতেন তারা। যখন লঞ্চ-স্টিমার ও কার্গো যাতায়াত করতো তখন মুরব্বিরা বড়াল পাড়ে দাঁড়িয়ে ঢেউয়ে পা ভেজাতো। পানির ঢেউয়ে ডাঙ্গায় উঠে আসতো মাছ। হুমরি খেয়ে ধরতেন সেই মাছ। বড়াল নদীর ইলিশ মাছ, পাবদা, চিংড়ি, চিতল, আইড় ও বোয়াল মাছের স্বাদই ছিল আলাদা। প্রচুর শুশুক ছিল বড়ালে। জেলেরা বড় বড় জাল ফেলে নৌকায় মাছ ধরতো। স্রোতঃস্বীনি বড়ালকে গলা টিপে হত্যা করতে দেখলাম আমরাই। চারঘাটে স্লুইস গেইট নির্মাণ করার পর পানি প্রবাহ কমে গেল। পদ্মার পানি বড়ালে আসা বন্ধ হলো। বন্ধ হলো যমুনার পানি বাড়ার সময় পানির চলাচল। নদী পথে যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে। সেচ সুবিধা কমেছে। বড়ালের মৃতপ্রায় অবস্থার জন্য সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই এলাকার শতকরা পঁচানব্বই ভাগ মানুষ। বড়ালের সঙ্কোচন জনজীবনে নিয়ে এসেছে অস্বস্তি, জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আর্থিক, সামজিক ও পরিবেশগতভাবে।

 

বড়ালে যখন পানি প্রবাহ ছিল স্বাভাবিক তখন শুকনা মৌসুমে নদী তীরের জমিতে সেচ দেয়া হতো নদীর পানি। পাওয়ার পাম্প দ্বারা। নালা বা খালে পানির প্রবাহ ছিল। তাতে বিলের অভ্যন্তরের জমিতেও সেচ দেয়া যেতো। নদীতে ক্লোজার নির্মান করার পর পানি না থাকায় সেচ হয়েছে শ্যালো বা ডিপ মেশিন নির্ভর। বড়াল নদী অববাহিকায় এখন ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরও নিচে নেমে গেছে।

 

নদী মরে যাওয়ায় বিরূপ প্রভাব পড়েছে বিশাল চলনবিলে। চলনবিলের প্রসিদ্ধ মৎস্য সম্পদ হ্রাস পেয়েছে। বিশাল গবাদী পশুর চারণভূমিতে আগের মতো মাসকালাই ও খেসারী ঘাস জন্মে না। তাতে গবাদীপশু সম্পদ মারাত্মভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। শুকনো মৌসুমে বড়ালে পানি প্রবাহ না থাকায় বিল শুকিয়ে যায়। বিলে পানির সঙ্কট দেখা দেয়। চাষী ও মৎস্যজীবীদের নানা সমস্যায় পরতে হয়েছে। জেলে সম্প্রদায় এখন বিলুপ্ত প্রায়। উত্তরাঞ্চলের মৎস্য ভার হিসাবে পরিচিত চলন বিলে ৭০ থেকে ৭৫ প্রকার মাছ পাওয়া যেতো। এখন তার অনেক প্রজাতিই বিলুপ্ত প্রায়।

 

স্লুইস গেইট সমূহ অপসারণ করার দাবি উঠেছে বহু বছর আগেই। কার কথা কে শোনে। এখন এই দাবি জোরালো হচ্ছে। বনপাড়া বাইপাস সড়ক ব্রিজ, বনপাড়া বাজার ব্রিজ, কৈলার খালিয়া ব্রিজ, তিরোইল ব্রিজ, আগ্রান ব্রিজসহ ছোট-বড় সকল ব্রিজ ও কালভার্ট অপসারণ করা হলেই কেবল বড়াল নদী আবার চলাচলের উপযোগী হবে।

 

 

নিউজটি শেয়ার করুন:

সর্বশেষ আপডেট



» মৎস্য বন্দর মহিপুরে চলছে খাস জমি দখলের মাহোৎসব; যেন দেখার কেউ নেই

» জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ/১৯ উপলক্ষে দশমিনায় সংবাদ সম্মেলন

» কলাপাড়ায় মৎস্য কর্মকর্তার সাথে সংবাদকর্মীদের মতবিনিময়

» মাদরাসা বোর্ডে পাসের হার ৮৮.৫৬ শতাংশ

» ৪১ প্রতিষ্ঠানের কেউ পাস করেনি

» রিফাত হত্যা মামলায় ৫ দিনের রিমান্ডে আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি

» এইচএসসিতে ৯০৯ প্রতিষ্ঠানে শতভাগ পাস

» বাবার কবর জিয়ারত করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত সা’দ এরশাদ

» বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

» এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ সকাল ১০টায় যেভাবে জানা যাবে

লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন

ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মো: আবুল কালাম আজাদ, খোকন
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : কামাল হোসেন খান
সম্পাদক : এডভোকেট মো: ফেরদৌস খান
বার্তা সম্পাদক : মো: সো‌হেল অাহ‌ম্মেদ
সহ-সম্পাদক : নুরুজ্জামান কাফি
মফস্বল বিভাগ প্রধান: উত্তম কুমার হাওলাদার
যোগাযোগ: বাড়ী- ৫০৬/এ, রোড- ৩৫,
মহাখালী, ডি ও এইচ এস, ঢাকা- ১২০৬,
ফোন: +৮৮ ০১৭৩১ ৬০০ ১৯৯, ৯৮৯১৮২৫,
বার্তা এবং বিজ্ঞাপন : + ৮৮ ০১৬৭৪ ৬৩২ ৫০৯।
বিজ্ঞাপন এবং নিউজ : + ৮৮ ০১৭১৬ ৮৯২ ৯৭০।
News: editor.kuakatanews@gmail.com
Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
আজ বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ, ৩রা শ্রাবণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

উত্তর জনপদের বড়াল নদী অস্তিত্ব সংকটে মৃত প্রায়

ইউটিউবে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:
Spread the love

বাকী বিল্লাহ পাবনা: উত্তর জনপদের অন্যতম নদী বড়াল। যা এখন মৃতপ্রায়।পদ্মা এবং যমুনা নদীর সংযোগ রক্ষাকারী বড়াল নদীর দৈর্ঘ্য দুইশত চার কিলোমিটার। রাজশাহীর চারঘাটে পদ্মা নদী এর উৎসস্থল। রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে যমুনায় মিশেছে পাবনার বেড়া উপজেলার কাছে। বড়াল হচ্ছে চলন বিলের প্রধান নদী। বড় থেকে বড়াল শব্দটির উৎপত্তি। এই এলাকার সবচেয়ে বড় নদী হেতু এই নামকরণ করা হয়েছে। বড়ালকে ‘বড়হর’ অর্থাৎ পদ্মার বড় হাওরও বলা হয়ে থাকে।পদ্মা এবং যমুনার পানি যখন বাড়ে বা কমে বড়াল নদী হয়ে সেই পানি প্রবেশ করে চলন বিলে। এতে বিল চালু থাকে। সে কারণেই বিলটির নাম ‘চলন’।

 

এই বিলের পানি সর্বদাই চলমান। চলনবিলের অভ্যন্তরে শত শত ছোট-বড় বিল ও খাল রয়েছে। এসব খাল প্রাকৃতিক। আবার বিল থেকেও ছোট নদীর উৎপত্তি হয়েছে। নদী থেকে খালও হয়েছে। এক কথায় বলা যায় চলন বিল হচ্ছে অসংখ্য স্রোতের জাল। আর এই জালের প্রধান সূত্র হচ্ছে বড়াল নদী। এ নদী থেকে আরও ৯টি নদীর উৎপত্তি হয়েছে। সেগুলো থেকে সৃষ্টি হয়েছে আরও প্রায় শতাধিক নালা বা খাল। বড়ালের মৃত্যুর কারণে মরে গেছে ছোট ছোট নদী, খাল ও চলনবিল। বড়াল মৃতপ্রায় তাই দেশের সর্ববৃহৎ বিল চলনে এখন শুকনা মৌসুমে পানি থাকে না। সে কারণে মাছের ভারও এখন প্রায় শূন্য।বড়ালকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। রাজশাহীর চারঘাট থেকে জন্ম নিয়ে নদীটি নাটোরের গুরুদাসপুরের কাছে আত্রাই নদীর সাথে মিলেছে। এই অংশকে বড়াল আপার বলা হয়। এই অংশের দৈর্ঘ্য ৮৪ কিলোমিটার। আর বড়াইগ্রামের আটঘড়ি থেকে বেরিয়ে বনপাড়া, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, সাঁথিয়া হয়ে শাহজাদপুরের বাঘাবাড়ি ঘাটের কাছে হুরাসাগর নদী হয়ে যমুনায় মিলিত হয়েছে, এই অংশ লোয়ার বড়াল। আপার বড়াল এর দৈর্ঘ্য ১২০ কিলোমিটার। গড় প্রস্থ ১২০ মিটার, গড় গভীরতা ৯ দশমিক ৯০ মিটার। ৭৭২ বর্গমিটার হচ্ছে নদীটির অববাহিকা। লোয়ার বড়াল এর গড় প্রস্থ ৬০ মিটার, গভীরতা ৫ মিটার ও অববাহিকা ৭৭০ বর্গ কিলোমিটার। মুসা খাঁ এবং নন্দকুঁজা বড়ালের দুটি শাখা নদী। মুসা খাঁ নদীর উৎপত্তি নাটোরের বাগাতিপাড়া হাপানিয়ায়। পাইকপাড়া গিয়ে মুসা খাঁ নদী থেকে উৎপত্তি হয়েছে নারোদ নদীর। এই নদীটি নন্দকুঁজা নদী হয়ে আত্রাই নদীতে মিশেছে। নারোদ নদী তীরেই আত্রাই উপজেলার পতিসরের রবীন্দ্র কাছারি বাড়ি। এই নদীকে নিয়েই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেছেন ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে …।’

 

বড়াল এর আর একটি শাখা নন্দকুঁজার উৎপত্তি নাটোরের আটঘড়ি থেকে। নদীটি নাটোর হয়ে গুরুদাসপুরের চাঁচকৈর নামক স্থানে আত্রাই নদীর সঙ্গে মিশেছে। নন্দকুঁজা এবং আত্রাই এর মিলন স্থল থেকে গুমানী নাম ধারণ করে চাটমোহরের নুন নগরে এসে বড়ালে মিশে আবার বড়াল নামেই বাঘাবাড়ি চলে গেছে। সেখানে করতোয়া, হুরাসাগর এবং বড়াল মিশে অগ্রসর হয়েছে যমুনায়।বড়াল নদীর এই দূরাবস্থার জন্য দায়ী কে? এক কথায় এলাকাবাসী বা বড়াল পাড়ের মানুষজন বলে থাকেন এর জন্য দায়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদী, পানি ও বন্যা বিষয়ক কিছু ভুল নীতি।পানি উন্নয়ন বোর্ড পাকিস্তান আমলে তৈরি হয়েছিল বন্যা প্রশমন বা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। ‘বন্যা নিয়ন্ত্রণ’ পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের ধারণা। এর মূল হচ্ছে বেগবান নদীকে বাঁধ দিয়ে তার প্রবাহ আটকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা। এই পদ্ধতিকে বলা হয় অবরোধ পন্থা বা ‘কর্ডন অ্যাপ্রোচ’। আধুনিক ধারণা তার উল্টো। তাতে বলা হচ্ছে, বন্যা নিয়ন্ত্রণ করার বিষয় নয়, প্রয়োজনও নেই।

 

সামগ্রিক বিচারে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করে কোন লাভ নেই। বাঁধ বসিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় পানি প্রবেশ রোধ করা যায়। তবে সেই বদ্ধ বা বিতাড়িত পানি নিকটবর্তী বা দূরবর্তী অন্য কোন স্থানে নদীর পাড় ভাঙবে বা আরেক এলাকা প্লাবিত করবে। নতুন এলাকায় বন্যার সূত্রপাত করবে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ হয় না, স্থানান্তর হয় মাত্র।বড়ালের স্বাভাবিক পানি চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই এলাকার প্রসিদ্ধ নদী বন্দরসমূহ মরে গেছে। চারঘাট, পুঠিয়া, বাগাতিপাড়া, দয়ারামপুর ক্যান্টনমেন্ট, বড়াইগ্রাম, বনপাড়া, রামনগর, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, মির্জাপুর, জোনাইল, বাঘা, ডেমড়া, সিলন্দা ইত্যাদি নদী বন্দর এখন মৃতপ্রায়।এই বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতেই পানি উন্নয়ন বোর্ড বড়াল বেসিন ডেভলপমেন্ট প্রজেক্টের আওতায় ১৯৮৫ সালে চারঘাটে বড়াল নদীর উৎসমুখে নির্মাণ করে ক্লোজার বা তিন দরজা বিশিষ্ট স্লইস গেইট। পদ্মা নদী থেকে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেয়া বড়াল নদী’র স্বাভাবিক গতিপথ বন্ধ করা হয় ১৯৯৫-৯৬ সালে নাটোরের আটঘড়ি নামক স্থানে আরও একটি পাঁচ দরজা বিশিষ্ট স্লুইস গেইট নির্মাণ করে। এই গেইটটি নির্মাণ করার ফলে দক্ষিণ দিকের অংশে পানি থাকলেও উত্তরের অংশে পানি চলাচল একবারেই বন্ধ হয়ে যায়।

 

এখানেই বড়ালের মুখে নির্মাণ করা হয় এক দরজা বিশিষ্ট একটি স্লুইস গেইট। একদিকে বড়ালের উৎসমুখে চারঘাটে স্লুইস গেইট, অন্যদিকে দীর্ঘদিন এত বড় একটি নদীর মুখে এক দরজার একটি স্লুইস গেইট নির্মাণ করায় বনপাড়া পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকায় নদী অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে। নদীর ভাটিতে বড়াল নদীর উপর তৃতীয় ও চতুর্থ স্লুইস গেইট নির্মাণ করা হয় ভাঙ্গুড়া এবং চাটমোহরের দহপাড়ার নিকটে। দহপাড়ার নিকটবর্তী স্লুইস গেইটটির উভয় পার্শ্বই শুকিয়ে যায় শুকনো মৌসুমে। যেহেতু নদীটিকে এভাবে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। অতএব এর পর যা হওয়ার তাই হয়েছে। যে যেখানে যতটুকু পারে নদী দখল করেছে। নদীর মধ্যে ঘর-বাড়ি, দোকান-গুদাম উঠিয়েছে। নদীর মধ্যে চাষাবাদ করা হচ্ছে। কোন কোন এলাকায় নদীতে আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে নদীর পানি চলাচল বন্ধ করে দিয়ে মাছ চাষ করছে।

 

বড়াল অববাহিকার ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। আশি’র দশক পর্যন্ত বড়াল ছিল স্থানীয় যোগাযোগ ও বাণিজ্যের চালিকাশক্তি তেমনি ছিল সংস্কৃতি ও বিনোদনের প্রাণকেন্দ্র। এই অঞ্চলের শতকরা নব্বইভাগ অধিবাসীই ছিল বড়াল নদীর উপর নির্ভরশীল। চারঘাটে স্লুইস গেইট নির্মাণ করার ফলে নদী সংকুচিত হতে থাকে, পানি প্রবাহ হ্রাস পায়। এর ফলে পরিবর্তিত হতে থাকে পরিবেশ ও বড়াল পাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকা। বড়াল অববাহিকার অর্থনীতি মূলত কৃষি, মৎস্য ও গবাদি পশুসম্পদ নির্ভর। ধান, চাল, মসুর, খেসারি, সরিষা, মাস কালাই প্রভৃতি উৎপাদনের জন্য বড়াল অববাহিকার সুখ্যাতি ছিল। স্থানীয় ভাষায় এগুলোকে বলা হয় ভুষালি ফসল। নৌপথে বড়াল পাড়ের ফসল যেতো চাঁদপুর, চট্টগাম, ঢাকা, নারয়ণগঞ্জ ও খুলনায়।

 

আশির দশকের শুরুর দিকেও বড় বড় নৌকা, বার্জ, কার্গোতে পণ্য সামগ্রী আনা-নেয়া হতো বড়াল নদী পথে। চলতো বড় বড় লঞ্চ ও স্টিমার। আমরা ছোট সময়ে গল্প শুনতাম আমার মুরব্বিদের কাছ থেকে ষাটের দশকে স্টিমার ও লঞ্চে বিভিন্ন যায়গা যাতায়াত করতেন তারা। যখন লঞ্চ-স্টিমার ও কার্গো যাতায়াত করতো তখন মুরব্বিরা বড়াল পাড়ে দাঁড়িয়ে ঢেউয়ে পা ভেজাতো। পানির ঢেউয়ে ডাঙ্গায় উঠে আসতো মাছ। হুমরি খেয়ে ধরতেন সেই মাছ। বড়াল নদীর ইলিশ মাছ, পাবদা, চিংড়ি, চিতল, আইড় ও বোয়াল মাছের স্বাদই ছিল আলাদা। প্রচুর শুশুক ছিল বড়ালে। জেলেরা বড় বড় জাল ফেলে নৌকায় মাছ ধরতো। স্রোতঃস্বীনি বড়ালকে গলা টিপে হত্যা করতে দেখলাম আমরাই। চারঘাটে স্লুইস গেইট নির্মাণ করার পর পানি প্রবাহ কমে গেল। পদ্মার পানি বড়ালে আসা বন্ধ হলো। বন্ধ হলো যমুনার পানি বাড়ার সময় পানির চলাচল। নদী পথে যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে। সেচ সুবিধা কমেছে। বড়ালের মৃতপ্রায় অবস্থার জন্য সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই এলাকার শতকরা পঁচানব্বই ভাগ মানুষ। বড়ালের সঙ্কোচন জনজীবনে নিয়ে এসেছে অস্বস্তি, জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আর্থিক, সামজিক ও পরিবেশগতভাবে।

 

বড়ালে যখন পানি প্রবাহ ছিল স্বাভাবিক তখন শুকনা মৌসুমে নদী তীরের জমিতে সেচ দেয়া হতো নদীর পানি। পাওয়ার পাম্প দ্বারা। নালা বা খালে পানির প্রবাহ ছিল। তাতে বিলের অভ্যন্তরের জমিতেও সেচ দেয়া যেতো। নদীতে ক্লোজার নির্মান করার পর পানি না থাকায় সেচ হয়েছে শ্যালো বা ডিপ মেশিন নির্ভর। বড়াল নদী অববাহিকায় এখন ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরও নিচে নেমে গেছে।

 

নদী মরে যাওয়ায় বিরূপ প্রভাব পড়েছে বিশাল চলনবিলে। চলনবিলের প্রসিদ্ধ মৎস্য সম্পদ হ্রাস পেয়েছে। বিশাল গবাদী পশুর চারণভূমিতে আগের মতো মাসকালাই ও খেসারী ঘাস জন্মে না। তাতে গবাদীপশু সম্পদ মারাত্মভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। শুকনো মৌসুমে বড়ালে পানি প্রবাহ না থাকায় বিল শুকিয়ে যায়। বিলে পানির সঙ্কট দেখা দেয়। চাষী ও মৎস্যজীবীদের নানা সমস্যায় পরতে হয়েছে। জেলে সম্প্রদায় এখন বিলুপ্ত প্রায়। উত্তরাঞ্চলের মৎস্য ভার হিসাবে পরিচিত চলন বিলে ৭০ থেকে ৭৫ প্রকার মাছ পাওয়া যেতো। এখন তার অনেক প্রজাতিই বিলুপ্ত প্রায়।

 

স্লুইস গেইট সমূহ অপসারণ করার দাবি উঠেছে বহু বছর আগেই। কার কথা কে শোনে। এখন এই দাবি জোরালো হচ্ছে। বনপাড়া বাইপাস সড়ক ব্রিজ, বনপাড়া বাজার ব্রিজ, কৈলার খালিয়া ব্রিজ, তিরোইল ব্রিজ, আগ্রান ব্রিজসহ ছোট-বড় সকল ব্রিজ ও কালভার্ট অপসারণ করা হলেই কেবল বড়াল নদী আবার চলাচলের উপযোগী হবে।

 

 

নিউজটি শেয়ার করুন:

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



Click Here

সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



About Us | Privacy Policy | Terms & Conditions | Contact Us | Sitemap
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মো: আবুল কালাম আজাদ, খোকন
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : কামাল হোসেন খান
সম্পাদক : এডভোকেট মো: ফেরদৌস খান
বার্তা সম্পাদক : মো: সো‌হেল অাহ‌ম্মেদ
সহ-সম্পাদক : নুরুজ্জামান কাফি
মফস্বল বিভাগ প্রধান: উত্তম কুমার হাওলাদার
যোগাযোগ: বাড়ী- ৫০৬/এ, রোড- ৩৫,
মহাখালী, ডি ও এইচ এস, ঢাকা- ১২০৬,
ফোন: +৮৮ ০১৭৩১ ৬০০ ১৯৯, ৯৮৯১৮২৫,
বার্তা এবং বিজ্ঞাপন : + ৮৮ ০১৬৭৪ ৬৩২ ৫০৯।
বিজ্ঞাপন এবং নিউজ : + ৮৮ ০১৭১৬ ৮৯২ ৯৭০।
News: editor.kuakatanews@gmail.com

© Copyright BY KuakataNews.Com

Design & Developed BY PopularITLimited