শুকুর আলীর ৬২ বছরে ভাগ্য ফিরলো কয়লার ইস্ত্রিতে

Spread the love

মোঃ রাসেল ইসলাম, বেনাপোল প্রতিনিধি: যশোরের শার্শা উপজেলার বসতপুর এক নম্বর কলোনি এলাকার বাসিন্দা তিনি। গ্রামে বিদ্যুতের প্রশ্নই ওঠে না। ছোট ভাই সে সময়ে ১২শ’ টাকা দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে একটি কয়লার ইস্ত্রি এনে দেন। নির্দিষ্ট করে সালটা মনে নেই। দেশ স্বাধীনের ৯-১০ বছর পরের কথা। এরপর তিনি সেই ইস্ত্রি দিয়ে লন্ড্রির কাজ শুরু করেন। এখনো করে চলেছেন একই কাজ।

 

শুকুর আলীর বাবা আব্দুর রহিম মিজি ও মা নূরজাহান বেগম কেউই বেঁচে নেই। গ্রামের বাজারের মধ্যে ছোট একটি দোকান। তার মধ্যে দুটো টেবিল আর দেওয়াল ঘেঁষে জমিয়ে রাখা হয়েছে কয়লা। এই কয়লার আগুন ইস্ত্রির ভেতর ঢুকিয়ে কাপড় ইস্ত্রি করেন শুকুর আলী। ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি এ কাজ করে চলেছেন। এ আয় দিয়েই কিনেছেন দুই বিঘা ধানিজমি। ছোট ছেলে জামির হোসেনকে পড়াচ্ছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।

 

শুকুর আলী (৬২) জানান, দেশ স্বাধীনের ৯-১০ বছর পর ছোট ভাই মনসুর আলী চট্টগ্রাম থেকে পিতলের তৈরি কয়লার ইস্ত্রি নিয়ে আসে। ১২শ’ টাকা দাম। সেই থেকে বসতপুর বাজারে কাপড় ইস্ত্রির কাজ শুরু, এখনো চলছে। বছর দুই আগে বসতপুর বাজারে ছোট একটি দোকান ভাড়া নেন তিনি। মাসে ৫০০ টাকা ঘর ভাড়া আর পাশের দোকান থেকে লাইন টেনে একটি বাল্ব জ্বালান। দোকানিকে মোটে ৩০ টাকা দেন। এর আগে তিনি বাজারের বিভিন্ন দোকানের সামনে লোকজনকে বলে একটু জায়গা নিয়ে এ কাজ করতেন। তিনি জানান, ইস্ত্রির কাজ শুরুর বছর খানেক পর বেনাপোল পোর্ট থানার ঘিবা গ্রামের জবেদা বেগমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। সংসার জীবনে তার দুই মেয়ে এবং দুই ছেলে। দু’টো মেয়ে ও বড় ছেলের বিয়ে হয়েছে। ছোট ছেলে জামির রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিবিএ অনার্স পাস করেন) পড়াশোনা করেন। এ মাসে তিনি মাস্টার্স পরীক্ষা দেবেন।

 

তিনি আরও জানান, প্রথম দিকে কাপড় প্রতি আটআনা পরে একটাকা করে নিতেন। এখন পাঁচ টাকা। আর শাড়ি প্রতি দশ টাকা। তখন প্রতিদিন ২০-৫০ টাকা আয় হতো। সংসার চলে যেতো। বিয়ের পর বাড়িতে হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পালতেন স্ত্রী। সংসারের খরচ থেকে টুকটাক জমিয়ে প্রথমে কেনেন পাঁচ কাঠা জমি। এরপর আবার কিছু সঞ্চয়, তারপর আস্তে আস্তে এখন দুই বিঘা ধানিজমির মালিক তিনি। সেই জমিতে নিজেরাই উৎপাদন করেন ধান। এতে তাদের বছরের খোরাকিটা হয়ে যায়। সবসময় প্রাণোচ্ছল মানুষটির জীবনে একটিই চাওয়া ছিল, অন্তত একটা ছেলেকে তিনি লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করবেন। তার সেই আশা এখন পূরণের দিকে। ছোট ছেলে জামির লেখাপড়ায় বেশ ভালো। এরইমধ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিসিএস পরীক্ষার। তিনি চান- একটি ভালো চাকরি জুটিয়ে পরিবারের হাল ধরতে।

 

তার মতে, বাবা হচ্ছেন সহজ-সরল মানুষ। খুবই সৎ আর কর্মঠ। কখনো তিনি কোনো বিষয়কে জটিল করে দেখতে চান না। জানা যায়, এলাকায় কোনো বাড়িতে বিয়ে বা অন্য কোনো অনুষ্ঠান হলে তিনি সেখান থেকে বস্তায় ভরে কয়লা সংগ্রহ করেন। সংকট দেখা দিলে মাঝেমধ্যে বস্তা প্রতি ১৬০ টাকা দরে কেনেন। ইস্ত্রি কেনার পর একবার হাত থেকে পড়ে কাঠের হাতলটি ভেঙে যায়। ওই একবারই সেটি মেরামত করতে হয়েছে। এছাড়া আর কোনো সমস্যা হয়নি। প্রতিবেশী কলেজ শিক্ষক আবু আব্দুল্লাহ বলেন, ‘মানুষটা খুব নিরীহ। কারো সঙ্গে কোনোদিন উচ্চস্বরে কথা বলেননি। সবাই তাকে শ্রদ্ধা করে বিশেষ করে তার সততার জন্য। এই বাজারে একমাত্র তারই ইস্ত্রির দোকান রয়েছে। বসতপুর ছাড়াও আশপাশের গ্রামের লোকজন তার কাছে কাপড় ইস্ত্রি করাতে আসেন।

নিউজটি শেয়ার করুন:

সর্বশেষ আপডেট



» বরগুনার পাথরঘাটায় গৃহবধূকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ

» নোবেলের আসল চেহারা ফাঁস করলো কলকাতা মিডিয়া!

» এবার ভারতে ইসলাম গ্রহণের হিড়িক

» গাজীপুরে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকায় ৩৭ যুবক-যুবতীকে গ্রেফতার

» আসামি ধরতে এবার ‘হুজুর’ সাজলেন পুলিশ

» মনের সুখই আসল সুখ বা অপরকে সুখী করানোই প্রকৃত সুখ

» কলকাতায় সড়ক দুর্ঘটনায় দুই বাংলাদেশী নিহত

» বেনাপোল চেকপোস্ট নারীর ব্যাগে মিলল ৪০ হাজার ডলার ও ১৩ লাখ রুপি

» বাংলাদেশের নতুন কোচ রাসেল ডমিঙ্গো

» প্রতিদিনের কথা এবং দৈনিক আলোকিত সকাল এ প্রকাশিত রেলওয়ে পুলিশ সম্পর্কিত সংবাদটি ভিত্তিহীন এবং বানোয়াট

লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন

ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মো: আবুল কালাম আজাদ, খোকন
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : কামাল হোসেন খান
সম্পাদক : এডভোকেট মো: ফেরদৌস খান
বার্তা সম্পাদক : মো: সো‌হেল অাহ‌ম্মেদ
সহ-সম্পাদক : নুরুজ্জামান কাফি
মফস্বল বিভাগ প্রধান: উত্তম কুমার হাওলাদার
যোগাযোগ: বাড়ী- ৫০৬/এ, রোড- ৩৫,
মহাখালী, ডি ও এইচ এস, ঢাকা- ১২০৬,
ফোন: +৮৮ ০১৭৩১ ৬০০ ১৯৯, ৯৮৯১৮২৫,
বার্তা এবং বিজ্ঞাপন : + ৮৮ ০১৬৭৪ ৬৩২ ৫০৯।
বিজ্ঞাপন এবং নিউজ : + ৮৮ ০১৭১৬ ৮৯২ ৯৭০।
News: editor.kuakatanews@gmail.com
Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
আজ রবিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ, ৩রা ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

শুকুর আলীর ৬২ বছরে ভাগ্য ফিরলো কয়লার ইস্ত্রিতে

ইউটিউবে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:
Spread the love

মোঃ রাসেল ইসলাম, বেনাপোল প্রতিনিধি: যশোরের শার্শা উপজেলার বসতপুর এক নম্বর কলোনি এলাকার বাসিন্দা তিনি। গ্রামে বিদ্যুতের প্রশ্নই ওঠে না। ছোট ভাই সে সময়ে ১২শ’ টাকা দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে একটি কয়লার ইস্ত্রি এনে দেন। নির্দিষ্ট করে সালটা মনে নেই। দেশ স্বাধীনের ৯-১০ বছর পরের কথা। এরপর তিনি সেই ইস্ত্রি দিয়ে লন্ড্রির কাজ শুরু করেন। এখনো করে চলেছেন একই কাজ।

 

শুকুর আলীর বাবা আব্দুর রহিম মিজি ও মা নূরজাহান বেগম কেউই বেঁচে নেই। গ্রামের বাজারের মধ্যে ছোট একটি দোকান। তার মধ্যে দুটো টেবিল আর দেওয়াল ঘেঁষে জমিয়ে রাখা হয়েছে কয়লা। এই কয়লার আগুন ইস্ত্রির ভেতর ঢুকিয়ে কাপড় ইস্ত্রি করেন শুকুর আলী। ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি এ কাজ করে চলেছেন। এ আয় দিয়েই কিনেছেন দুই বিঘা ধানিজমি। ছোট ছেলে জামির হোসেনকে পড়াচ্ছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।

 

শুকুর আলী (৬২) জানান, দেশ স্বাধীনের ৯-১০ বছর পর ছোট ভাই মনসুর আলী চট্টগ্রাম থেকে পিতলের তৈরি কয়লার ইস্ত্রি নিয়ে আসে। ১২শ’ টাকা দাম। সেই থেকে বসতপুর বাজারে কাপড় ইস্ত্রির কাজ শুরু, এখনো চলছে। বছর দুই আগে বসতপুর বাজারে ছোট একটি দোকান ভাড়া নেন তিনি। মাসে ৫০০ টাকা ঘর ভাড়া আর পাশের দোকান থেকে লাইন টেনে একটি বাল্ব জ্বালান। দোকানিকে মোটে ৩০ টাকা দেন। এর আগে তিনি বাজারের বিভিন্ন দোকানের সামনে লোকজনকে বলে একটু জায়গা নিয়ে এ কাজ করতেন। তিনি জানান, ইস্ত্রির কাজ শুরুর বছর খানেক পর বেনাপোল পোর্ট থানার ঘিবা গ্রামের জবেদা বেগমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। সংসার জীবনে তার দুই মেয়ে এবং দুই ছেলে। দু’টো মেয়ে ও বড় ছেলের বিয়ে হয়েছে। ছোট ছেলে জামির রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিবিএ অনার্স পাস করেন) পড়াশোনা করেন। এ মাসে তিনি মাস্টার্স পরীক্ষা দেবেন।

 

তিনি আরও জানান, প্রথম দিকে কাপড় প্রতি আটআনা পরে একটাকা করে নিতেন। এখন পাঁচ টাকা। আর শাড়ি প্রতি দশ টাকা। তখন প্রতিদিন ২০-৫০ টাকা আয় হতো। সংসার চলে যেতো। বিয়ের পর বাড়িতে হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পালতেন স্ত্রী। সংসারের খরচ থেকে টুকটাক জমিয়ে প্রথমে কেনেন পাঁচ কাঠা জমি। এরপর আবার কিছু সঞ্চয়, তারপর আস্তে আস্তে এখন দুই বিঘা ধানিজমির মালিক তিনি। সেই জমিতে নিজেরাই উৎপাদন করেন ধান। এতে তাদের বছরের খোরাকিটা হয়ে যায়। সবসময় প্রাণোচ্ছল মানুষটির জীবনে একটিই চাওয়া ছিল, অন্তত একটা ছেলেকে তিনি লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করবেন। তার সেই আশা এখন পূরণের দিকে। ছোট ছেলে জামির লেখাপড়ায় বেশ ভালো। এরইমধ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিসিএস পরীক্ষার। তিনি চান- একটি ভালো চাকরি জুটিয়ে পরিবারের হাল ধরতে।

 

তার মতে, বাবা হচ্ছেন সহজ-সরল মানুষ। খুবই সৎ আর কর্মঠ। কখনো তিনি কোনো বিষয়কে জটিল করে দেখতে চান না। জানা যায়, এলাকায় কোনো বাড়িতে বিয়ে বা অন্য কোনো অনুষ্ঠান হলে তিনি সেখান থেকে বস্তায় ভরে কয়লা সংগ্রহ করেন। সংকট দেখা দিলে মাঝেমধ্যে বস্তা প্রতি ১৬০ টাকা দরে কেনেন। ইস্ত্রি কেনার পর একবার হাত থেকে পড়ে কাঠের হাতলটি ভেঙে যায়। ওই একবারই সেটি মেরামত করতে হয়েছে। এছাড়া আর কোনো সমস্যা হয়নি। প্রতিবেশী কলেজ শিক্ষক আবু আব্দুল্লাহ বলেন, ‘মানুষটা খুব নিরীহ। কারো সঙ্গে কোনোদিন উচ্চস্বরে কথা বলেননি। সবাই তাকে শ্রদ্ধা করে বিশেষ করে তার সততার জন্য। এই বাজারে একমাত্র তারই ইস্ত্রির দোকান রয়েছে। বসতপুর ছাড়াও আশপাশের গ্রামের লোকজন তার কাছে কাপড় ইস্ত্রি করাতে আসেন।

নিউজটি শেয়ার করুন:

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



Click Here

সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



About Us | Privacy Policy | Terms & Conditions | Contact Us | Sitemap
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মো: আবুল কালাম আজাদ, খোকন
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : কামাল হোসেন খান
সম্পাদক : এডভোকেট মো: ফেরদৌস খান
বার্তা সম্পাদক : মো: সো‌হেল অাহ‌ম্মেদ
সহ-সম্পাদক : নুরুজ্জামান কাফি
মফস্বল বিভাগ প্রধান: উত্তম কুমার হাওলাদার
যোগাযোগ: বাড়ী- ৫০৬/এ, রোড- ৩৫,
মহাখালী, ডি ও এইচ এস, ঢাকা- ১২০৬,
ফোন: +৮৮ ০১৭৩১ ৬০০ ১৯৯, ৯৮৯১৮২৫,
বার্তা এবং বিজ্ঞাপন : + ৮৮ ০১৬৭৪ ৬৩২ ৫০৯।
বিজ্ঞাপন এবং নিউজ : + ৮৮ ০১৭১৬ ৮৯২ ৯৭০।
News: editor.kuakatanews@gmail.com

© Copyright BY KuakataNews.Com

Design & Developed BY PopularITLimited