প্রতিটি ঢেউয়ের সাথে ক্ষয়ে যায় মানতাদের ছোট-ছোট স্বপ্ন” নৌকায় জন্ম, নৌকায় বসবাস, নৌকায় মৃত্যু 

জাহিদ রিপন, পটুয়াখালী :নৌকায় জন্ম, নৌকায় বসবাস, নৌকাতেই মৃত্যু। নেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানসহ নন্যুতম মৌলিক অধিকার। ছোট নৌকায় নদ-নদীতে মাছ ধরে চলে জীবন-জিবীকা। সারাদিনের রোজগারে সন্ধ্যায় উনুন জলে নৌকার ছাউনিতে। সর্বহারা কিংবা নি:স্ব বলে সমাজে পরিচিত হলেও, সমাজ ও সভ্যতা থেকে ছিটকে পড়া এ মানুষগুলোই নাম মানতা। জন্ম নিবন্ধন, ঠিকানা বিহীন আর কুসংস্কারাচ্ছন্ন প্রায় পাচ শতাধিক মানতা জনগোষ্ঠী প্রায় শত বছর ধরে বসবাস করছে পটুয়াখালীর রাংগাবালী, গলাচিপা ও বাউফলের নদ-নদীসহ সাগর মোহনায়। সাগরের নোনা জল যেমন জীবন বাচায়, তেমনি সাগরের এক-একটি ঢেউয়ের সাথে ক্ষয়ে যায় তাদের ছোট-ছোট স্বপ্ন।

 

একখন্ড জমির মালিকানা না থাকায় নদীতে বসবাসকারী এ সম্প্রাদায়কে প্রতিনিয়িত প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর নানা প্রতিকুলতার সাথে করতে হচ্ছে লড়াই। যেসব নদীর পানিতে জোয়ার-ভাটার টান খুব ধীর তাদের নৌকার বহর নোঙ্গর করে সেখানেই। দিনের বেলা নদীর তীরে থাকলেও চোর-ডাকাতের ভয়ে রাতে মাঝ নদীতেই অবস্থান নেয়। মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এ সম্প্রদায় বেঁচে থাকার জন্য জীবিকা নির্বাহ করে মাছ ধরে। মাছ পেলে তা বিক্রি করে জোটে খাবার। না পেলে উপোস। নৌকার ছাউনিতেই জন্ম হয় শিশুদের। পানি পড়ে যাওয়ার ভয়ে কোমড়ে দড়ি বেধে বেড়া ওঠা এ নৌকাতেই। শিক্ষাসহ সব অধিকার বঞ্চিত থেকে একটু বাড়ন্ত হলেই বাবা-মার সাথে নেমে যায় জীবনযুদ্ধে। আর এক খন্ড জমির মালিকানা না থাকায় অনেক সময় মৃতের দেহ ভাসিয়ে দিতে হয় নদীর জলে। কিছু সদস্যের রয়েছে জাতীয় পরিচয়পত্র। তবে নিদৃস্ট কোনো বসতি থাকায় এতে যে স্থায়ী ঠিকানা লেখা রয়েছে তা মানতে নারাজ অনেক ইউপি মেম্বার ও চেয়ারম্যানরা। স্থায়ী আবাস না থাকায় তাদের কাছ থেকে ট্যাক্সও গ্রহন করে না স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে দারিদ্রসীমার নিচে বসবাসকারী এ জনগোষ্ঠীর কপালে কখনই জোটে না সরকারের সামাজিক নিরাপত্তার সহায়তা।

 

মানতাদের সাতে আলপচারিতায় জানায়, নদী বা সাগর মোহনায় বসবাস করায় দক্ষিণাঞ্চলের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সুপার সাইক্লোন সিডরের তান্ডবে এদের প্রায় অর্ধশতাধিক নৌকা ডুবে যায়। সেসময় জীবন বাঁচাতে পারলেও মাছ ধরার জাল এবং বড়শি হারিয়ে অনেকে হয়ে পড়ে নি:স্ব। সিডর পরবর্তী সময়ে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ সহায়তা, ঘর নির্মাণসহ নানা সুবিধা প্রদান করা হলেও এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে এরা। প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা তো দূরের কথা, নেই স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন কিংবা বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা। শিক্ষা, জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি, সমাজ-সভ্যতার আচারের ছোঁয়া লাগেনা এদের গায়ে। রোগ-বালাই সারতে দৌড়ে যায় স্থানীয় কবিরাজ, বৈদ্যের কাছে।

 

তিন সন্তানের জননী রোকেয়া বেগম (৩৫) জানান, জেলার বাউফলের কালাইয়ার আদিবাসী ছিলেন। নদী ভাঙনে নি:স্ব হয়ে শত বছর আগে তার পূর্ব পুরুষরা চরমোন্তাজ ইউনিয়নের বুড়াগৌরঙ্গ নদীর কিনারে ঘাটি বাধেন। তখন থেকেই এ নদী তীরেই তাদের বসবাস। বাবা সালাম সরদার ও মা রাহিমা অনেক আগেই মারা গেছেন। স্বামী আলতাফ সরদারকে ছেলে শাকিব, আখিদুল ও নাজিম মাছ ধরতে সহায়তা করে। এতেই জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন তারা। ছয় সন্তান নিয়ে ছোট্ট একটি নৌকার ছাউনিতে পারুজান বিবির (৪০) বসবাস। জানান, অন্যদের মত জাল না থাকায় বড়শি দিয়ে মাছ ধরেন। তাই আয়-রোজগার কম। ফলে সংসার চলে টেনেটুনে।

 

প্রায় শত বছর ধরে নদী এবং সাগর মোহনায় বসবাসকারী এ জনগোষ্ঠীর অনেকেই এখন ফিরতে চায় স্বাভাবিক জীবনের মুল ¯্রােতে। তবে এ পুর্নবাসনে তারা চান সরকারী সহায়তা। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হোসনে ইয়াসমিন করিমী বলেন, বিভিন্ন এলাকার নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্থ এ জনগোষ্ঠীর স্থলভাগে ঠিকানা না থাকায় শিশুরা শিক্ষা বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে। জেলা প্রশাসক ড.মাসুমুর রহমান বলেন, মৎস্য পেশায় নিয়োজিত এ জনগোষ্ঠীকে স্বাভাবিক জীবনের মুল ¯্রােতে ফিরিয়ে আনতে পারলে সকল মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা যাবে।

সংবাদটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে শেয়ার করুন

সর্বশেষ আপডেট



» কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস আন্তঃনগর ট্রেনের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

» পদ্মার বুকে ৩২ পিলার, বসছে আরেক স্প্যান

» কম বয়সে বিয়ে করার ৬টি সুফল

» নাচতে গিয়ে জ্ঞান হারালেন জ্যাকলিন

» বুয়েট শহীদ মিনার থেকে এবার মুছে ফেলা হলো ছাত্রলীগের নাম

» নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মা ইলিশ শিকারের অপরাধে ১৭৯ জন জেলেকে আটক

» শিক্ষা বঞ্চিত জলে ভাসা মান্তা পরিবার গুলো

» নেত্রকোনায় পাগলিটা মা হলেন, বাবা হলো না কেউ

» ফরিদপুর শহরে আবাসিক হোটেল থেকে আপত্তিকর অবস্থায় ১১ নারী-পুরুষ ধরা

» ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নবজাতককে হাসপাতালে রেখে মা উধাও

লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন

ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মো: আবুল কালাম আজাদ, খোকন
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : কামাল হোসেন খান
সম্পাদক : এডভোকেট মো: ফেরদৌস খান
বার্তা সম্পাদক : মো: সো‌হেল অাহ‌ম্মেদ
সহ-সম্পাদক : নুরুজ্জামান কাফি
মফস্বল বিভাগ প্রধান: উত্তম কুমার হাওলাদার
যোগাযোগ: বাড়ী- ৫০৬/এ, রোড- ৩৫,
মহাখালী, ডি ও এইচ এস, ঢাকা- ১২০৬,
ফোন: +৮৮ ০১৭৩১ ৬০০ ১৯৯, ৯৮৯১৮২৫,
বার্তা এবং বিজ্ঞাপন : + ৮৮ ০১৬৭৪ ৬৩২ ৫০৯।
বিজ্ঞাপন এবং নিউজ : + ৮৮ ০১৭১৬ ৮৯২ ৯৭০।
News: editor.kuakatanews@gmail.com
Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
আজ বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ, ১লা কার্তিক ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

প্রতিটি ঢেউয়ের সাথে ক্ষয়ে যায় মানতাদের ছোট-ছোট স্বপ্ন” নৌকায় জন্ম, নৌকায় বসবাস, নৌকায় মৃত্যু 

ইউটিউবে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

জাহিদ রিপন, পটুয়াখালী :নৌকায় জন্ম, নৌকায় বসবাস, নৌকাতেই মৃত্যু। নেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানসহ নন্যুতম মৌলিক অধিকার। ছোট নৌকায় নদ-নদীতে মাছ ধরে চলে জীবন-জিবীকা। সারাদিনের রোজগারে সন্ধ্যায় উনুন জলে নৌকার ছাউনিতে। সর্বহারা কিংবা নি:স্ব বলে সমাজে পরিচিত হলেও, সমাজ ও সভ্যতা থেকে ছিটকে পড়া এ মানুষগুলোই নাম মানতা। জন্ম নিবন্ধন, ঠিকানা বিহীন আর কুসংস্কারাচ্ছন্ন প্রায় পাচ শতাধিক মানতা জনগোষ্ঠী প্রায় শত বছর ধরে বসবাস করছে পটুয়াখালীর রাংগাবালী, গলাচিপা ও বাউফলের নদ-নদীসহ সাগর মোহনায়। সাগরের নোনা জল যেমন জীবন বাচায়, তেমনি সাগরের এক-একটি ঢেউয়ের সাথে ক্ষয়ে যায় তাদের ছোট-ছোট স্বপ্ন।

 

একখন্ড জমির মালিকানা না থাকায় নদীতে বসবাসকারী এ সম্প্রাদায়কে প্রতিনিয়িত প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর নানা প্রতিকুলতার সাথে করতে হচ্ছে লড়াই। যেসব নদীর পানিতে জোয়ার-ভাটার টান খুব ধীর তাদের নৌকার বহর নোঙ্গর করে সেখানেই। দিনের বেলা নদীর তীরে থাকলেও চোর-ডাকাতের ভয়ে রাতে মাঝ নদীতেই অবস্থান নেয়। মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এ সম্প্রদায় বেঁচে থাকার জন্য জীবিকা নির্বাহ করে মাছ ধরে। মাছ পেলে তা বিক্রি করে জোটে খাবার। না পেলে উপোস। নৌকার ছাউনিতেই জন্ম হয় শিশুদের। পানি পড়ে যাওয়ার ভয়ে কোমড়ে দড়ি বেধে বেড়া ওঠা এ নৌকাতেই। শিক্ষাসহ সব অধিকার বঞ্চিত থেকে একটু বাড়ন্ত হলেই বাবা-মার সাথে নেমে যায় জীবনযুদ্ধে। আর এক খন্ড জমির মালিকানা না থাকায় অনেক সময় মৃতের দেহ ভাসিয়ে দিতে হয় নদীর জলে। কিছু সদস্যের রয়েছে জাতীয় পরিচয়পত্র। তবে নিদৃস্ট কোনো বসতি থাকায় এতে যে স্থায়ী ঠিকানা লেখা রয়েছে তা মানতে নারাজ অনেক ইউপি মেম্বার ও চেয়ারম্যানরা। স্থায়ী আবাস না থাকায় তাদের কাছ থেকে ট্যাক্সও গ্রহন করে না স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে দারিদ্রসীমার নিচে বসবাসকারী এ জনগোষ্ঠীর কপালে কখনই জোটে না সরকারের সামাজিক নিরাপত্তার সহায়তা।

 

মানতাদের সাতে আলপচারিতায় জানায়, নদী বা সাগর মোহনায় বসবাস করায় দক্ষিণাঞ্চলের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সুপার সাইক্লোন সিডরের তান্ডবে এদের প্রায় অর্ধশতাধিক নৌকা ডুবে যায়। সেসময় জীবন বাঁচাতে পারলেও মাছ ধরার জাল এবং বড়শি হারিয়ে অনেকে হয়ে পড়ে নি:স্ব। সিডর পরবর্তী সময়ে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ সহায়তা, ঘর নির্মাণসহ নানা সুবিধা প্রদান করা হলেও এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে এরা। প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা তো দূরের কথা, নেই স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন কিংবা বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা। শিক্ষা, জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি, সমাজ-সভ্যতার আচারের ছোঁয়া লাগেনা এদের গায়ে। রোগ-বালাই সারতে দৌড়ে যায় স্থানীয় কবিরাজ, বৈদ্যের কাছে।

 

তিন সন্তানের জননী রোকেয়া বেগম (৩৫) জানান, জেলার বাউফলের কালাইয়ার আদিবাসী ছিলেন। নদী ভাঙনে নি:স্ব হয়ে শত বছর আগে তার পূর্ব পুরুষরা চরমোন্তাজ ইউনিয়নের বুড়াগৌরঙ্গ নদীর কিনারে ঘাটি বাধেন। তখন থেকেই এ নদী তীরেই তাদের বসবাস। বাবা সালাম সরদার ও মা রাহিমা অনেক আগেই মারা গেছেন। স্বামী আলতাফ সরদারকে ছেলে শাকিব, আখিদুল ও নাজিম মাছ ধরতে সহায়তা করে। এতেই জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন তারা। ছয় সন্তান নিয়ে ছোট্ট একটি নৌকার ছাউনিতে পারুজান বিবির (৪০) বসবাস। জানান, অন্যদের মত জাল না থাকায় বড়শি দিয়ে মাছ ধরেন। তাই আয়-রোজগার কম। ফলে সংসার চলে টেনেটুনে।

 

প্রায় শত বছর ধরে নদী এবং সাগর মোহনায় বসবাসকারী এ জনগোষ্ঠীর অনেকেই এখন ফিরতে চায় স্বাভাবিক জীবনের মুল ¯্রােতে। তবে এ পুর্নবাসনে তারা চান সরকারী সহায়তা। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হোসনে ইয়াসমিন করিমী বলেন, বিভিন্ন এলাকার নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্থ এ জনগোষ্ঠীর স্থলভাগে ঠিকানা না থাকায় শিশুরা শিক্ষা বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে। জেলা প্রশাসক ড.মাসুমুর রহমান বলেন, মৎস্য পেশায় নিয়োজিত এ জনগোষ্ঠীকে স্বাভাবিক জীবনের মুল ¯্রােতে ফিরিয়ে আনতে পারলে সকল মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা যাবে।

সংবাদটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে শেয়ার করুন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



Click Here

সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



About Us | Privacy Policy | Terms & Conditions | Contact Us | Sitemap
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মো: আবুল কালাম আজাদ, খোকন
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : কামাল হোসেন খান
সম্পাদক : এডভোকেট মো: ফেরদৌস খান
বার্তা সম্পাদক : মো: সো‌হেল অাহ‌ম্মেদ
সহ-সম্পাদক : নুরুজ্জামান কাফি
মফস্বল বিভাগ প্রধান: উত্তম কুমার হাওলাদার
যোগাযোগ: বাড়ী- ৫০৬/এ, রোড- ৩৫,
মহাখালী, ডি ও এইচ এস, ঢাকা- ১২০৬,
ফোন: +৮৮ ০১৭৩১ ৬০০ ১৯৯, ৯৮৯১৮২৫,
বার্তা এবং বিজ্ঞাপন : + ৮৮ ০১৬৭৪ ৬৩২ ৫০৯।
বিজ্ঞাপন এবং নিউজ : + ৮৮ ০১৭১৬ ৮৯২ ৯৭০।
News: editor.kuakatanews@gmail.com

© Copyright BY KuakataNews.Com

Design & Developed BY PopularITLimited