রাঙ্গাবালীতে ১২৪ বেওয়ারিশের গণকবর সুধুই স্মৃতি

সঞ্জিব দাস, গলাচিপা: ‘নদীর কুলে এসে ভিড়ে লঞ্চ। কিন্তু সেই লঞ্চে যাত্রীর পরিবর্তে ছিল লাশ বোঝাই। যেদিকে চোখ যায় শুধু লাশের সারি। কেউ জড়িয়ে রেখেছে আদরের সন্তানকে, কেউ আবার প্রিয়জনকে। সেদিন স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। পুরো এলাকায় জুড়ে ছিল কান্নার রোল ।

 

এ দৃশ্য দুস্বপ্নের মত দু’চোখে আজও ভেসে ওঠে।’ ১৫ বছর আগে ঢাকা-রাঙ্গাবালী নৌরুটের যাত্রীবাহী এমভি সালাউদ্দিন-২ লঞ্চডুবিতে নিহতদের গণকবর দেওয়ার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার রাঙ্গাবালী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর হোসেন আকন প্রতিবেদককে এসব কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, ‘লঞ্চডুবির দুইদিন পর নিহতদের লাশ একটি লঞ্চে রাঙ্গাবালীতে নিয়ে আসা হয়। এ খবর শুনে সেইদিন হাজার হাজার মানুষ ছুটে এসেছিল। লাশগুলো পচে ফুলে যাওয়ায় পরিবার সদস্যরা শনাক্ত করতে পারেনি। তাই গণকবর খুড়ে লাশগুলো দাফন করা হয়।’ সূত্রে জানা গেছে, ২০০২ সালের ৩ মে ঢাকার সদরঘাট থেকে রাঙ্গাবালীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা যাত্রীবাহী এমভি সালাউদ্দিন-২ নামের লঞ্চ মেঘনা নদীর ষাটনলে ঝড়ের কবলে পড়ে ডুবে যায়।

 

এ ঘটনার তিন দিন পর লঞ্চসহ তিন শতাধিক যাত্রীর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে কিছু মৃতদেহ পরিবারের লোকজন শনাক্ত করে বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যায়। বাকি ১২৪টি লাশ এমভি রহমান নামের অপর একটি লঞ্চে করে রাঙ্গাবালীর খালগোড়া এলাকায় নিয়ে আসা হয়। লাশগুলো পচে ফুলে যাওয়ায় পরিবার সদস্যরা শনাক্ত করতে পারেনি। তাই বেওয়ারিশ হিসেবে সেখানে গণকবর খুড়ে ওইসব লাশ দাফন করা হয়। তৎকালীন রাঙ্গাবালী রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ও এডিএমডির সভাপতি আমির হোসেন মল্লিক বলেন, ‘সালাউদ্দিন-২ লঞ্চডুবিতে নিহতদের লাশ লঞ্চে করে আনার খবর শুনে ছুটে যাই। লাশগুলো পচে ফুলে যাওয়ায় দুর্গন্ধে কাছাকাছি যাওয়া যাচ্ছিল না। তবুও লঞ্চ থেকে লাশগুলো নামাতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করি। তখন বেশ কিছু তরুণ এবং যুবক সেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করে লাশগুলো গণকবর দেয়।’ এ লঞ্চ দুর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে ফেরা উপজেলার ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের কাউখালী গ্রামের মাছুম বিল্লাহ বলেন, ‘আমি সেই লঞ্চের যাত্রী ছিলাম।

 

হঠাৎ রাত সাড়ে ৯ টায় কিছু বুঝে ওঠার আগেই লঞ্চটি ডুবে যায়। অনেক চেষ্টার পর লঞ্চের ভেতর থেকে বের হয়ে ভেসে ছিলাম। পরে উদ্ধারকারীরা আমাকে উদ্ধার করে। সেই ভয়াবহ রাতের কথা আজও মনে পড়ে।’ সরেজমিনে দেখা গেছে, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে খালগোড়া গণকবর এখন অস্তিত্বহীন। ইতোমধ্যে ২-৩টি কবর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বাকিগুলোও রয়েছে অরক্ষিত অবস্থায়। সেখানে এখন অস্তিত্ব হিসেবে রয়েছে ‘রাঙ্গাবালী গণকবর হাফিজিয়া মাদ্রাসা এবং শিশু এতিমখানা ও লিল্লাহ বোডিং’। ২০১১ সালে এই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু হয়। তবে এখন সেখানে তেমন কার্যক্রম লক্ষ্য করা যায়নি।

 

স্থানীয়রা জানায়, সরকারি কিংবা বেসরকারি উদ্যোগ না নেওয়ায় ১৫ বছর অতিবাহিত হয়ে গেলেও গণকবর অরক্ষিত রয়েছে। তাছাড়া বর্তমান প্রজন্মের কাছে এ ঘটনা এখন অজানা। এ ব্যাপারে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘গণকবর দীর্ঘদিন ধরে অবহেলায় রয়েছে। ইতোমধ্যে এ বিষয়টি আমাদের দৃষ্টিতে এসেছে। জেলা পরিষদ এবং উপজেলা পরিষদের যৌথ উদ্যোগে ওই গণকবর রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি এটিকে উপজেলা গণকবরস্থানে উন্নিত করা হবে।’

সংবাদটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে শেয়ার করুন

সর্বশেষ আপডেট



» রাজাপুরে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে বসতঘর ক্ষতিগ্রস্থ ৫ শতাধিক পরিবারে হাহাকার, দ্রুত মাথা গোঁজার ঠাঁই চায় গৃহহীনরা!

» গলাচিপায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ৫ম শ্রেণির সমাপনী/১৯ শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত

» পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সহকর্মীর ছুরিকাঘাতে চীনা নাগরিক নিহত

» রাজশাহীতে বাড়ির ছাদে লুকিয়ে রেখেছিল ১৫ মণ পেঁয়াজ

» চট্টগ্রামে গ্যাস লাইনে বিস্ফোরণ: তদন্ত কমিটি গঠন

» ফেসবুক লাইভে: আমি রাঙ্গার মেয়ে, বাবাকে নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই (ভিডিও)

» ডামুড্যার সিড্যায় ৩৬ নং মধ্য সিড্যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের বিদায় অনুষ্ঠান

» যাতায়াতের একমাত্র রাস্থা বন্ধ বিপাকে ১৩ পরিবার

» বাগেরহাটে কাড়াপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণীর বিদায় অনুষ্ঠান

» বরিশালের মেয়ে নায়লা নাঈমের জীবনী আসছে একুশে বইমেলা ২০২০ এ

লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন

ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মো: আবুল কালাম আজাদ, খোকন
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : কামাল হোসেন খান
সম্পাদক : এডভোকেট মো: ফেরদৌস খান
বার্তা সম্পাদক : মো: সো‌হেল অাহ‌ম্মেদ
সহ-সম্পাদক : নুরুজ্জামান কাফি
মফস্বল বিভাগ প্রধান: উত্তম কুমার হাওলাদার
যোগাযোগ: বাড়ী- ৫০৬/এ, রোড- ৩৫,
মহাখালী, ডি ও এইচ এস, ঢাকা- ১২০৬,
ফোন: +৮৮ ০১৭৩১ ৬০০ ১৯৯, ৯৮৯১৮২৫,
বার্তা এবং বিজ্ঞাপন : + ৮৮ ০১৬৭৪ ৬৩২ ৫০৯।
বিজ্ঞাপন এবং নিউজ : + ৮৮ ০১৭১৬ ৮৯২ ৯৭০।
News: editor.kuakatanews@gmail.com
Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
আজ রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ, ২রা অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

রাঙ্গাবালীতে ১২৪ বেওয়ারিশের গণকবর সুধুই স্মৃতি

ইউটিউবে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

সঞ্জিব দাস, গলাচিপা: ‘নদীর কুলে এসে ভিড়ে লঞ্চ। কিন্তু সেই লঞ্চে যাত্রীর পরিবর্তে ছিল লাশ বোঝাই। যেদিকে চোখ যায় শুধু লাশের সারি। কেউ জড়িয়ে রেখেছে আদরের সন্তানকে, কেউ আবার প্রিয়জনকে। সেদিন স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। পুরো এলাকায় জুড়ে ছিল কান্নার রোল ।

 

এ দৃশ্য দুস্বপ্নের মত দু’চোখে আজও ভেসে ওঠে।’ ১৫ বছর আগে ঢাকা-রাঙ্গাবালী নৌরুটের যাত্রীবাহী এমভি সালাউদ্দিন-২ লঞ্চডুবিতে নিহতদের গণকবর দেওয়ার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার রাঙ্গাবালী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর হোসেন আকন প্রতিবেদককে এসব কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, ‘লঞ্চডুবির দুইদিন পর নিহতদের লাশ একটি লঞ্চে রাঙ্গাবালীতে নিয়ে আসা হয়। এ খবর শুনে সেইদিন হাজার হাজার মানুষ ছুটে এসেছিল। লাশগুলো পচে ফুলে যাওয়ায় পরিবার সদস্যরা শনাক্ত করতে পারেনি। তাই গণকবর খুড়ে লাশগুলো দাফন করা হয়।’ সূত্রে জানা গেছে, ২০০২ সালের ৩ মে ঢাকার সদরঘাট থেকে রাঙ্গাবালীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা যাত্রীবাহী এমভি সালাউদ্দিন-২ নামের লঞ্চ মেঘনা নদীর ষাটনলে ঝড়ের কবলে পড়ে ডুবে যায়।

 

এ ঘটনার তিন দিন পর লঞ্চসহ তিন শতাধিক যাত্রীর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে কিছু মৃতদেহ পরিবারের লোকজন শনাক্ত করে বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যায়। বাকি ১২৪টি লাশ এমভি রহমান নামের অপর একটি লঞ্চে করে রাঙ্গাবালীর খালগোড়া এলাকায় নিয়ে আসা হয়। লাশগুলো পচে ফুলে যাওয়ায় পরিবার সদস্যরা শনাক্ত করতে পারেনি। তাই বেওয়ারিশ হিসেবে সেখানে গণকবর খুড়ে ওইসব লাশ দাফন করা হয়। তৎকালীন রাঙ্গাবালী রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ও এডিএমডির সভাপতি আমির হোসেন মল্লিক বলেন, ‘সালাউদ্দিন-২ লঞ্চডুবিতে নিহতদের লাশ লঞ্চে করে আনার খবর শুনে ছুটে যাই। লাশগুলো পচে ফুলে যাওয়ায় দুর্গন্ধে কাছাকাছি যাওয়া যাচ্ছিল না। তবুও লঞ্চ থেকে লাশগুলো নামাতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করি। তখন বেশ কিছু তরুণ এবং যুবক সেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করে লাশগুলো গণকবর দেয়।’ এ লঞ্চ দুর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে ফেরা উপজেলার ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের কাউখালী গ্রামের মাছুম বিল্লাহ বলেন, ‘আমি সেই লঞ্চের যাত্রী ছিলাম।

 

হঠাৎ রাত সাড়ে ৯ টায় কিছু বুঝে ওঠার আগেই লঞ্চটি ডুবে যায়। অনেক চেষ্টার পর লঞ্চের ভেতর থেকে বের হয়ে ভেসে ছিলাম। পরে উদ্ধারকারীরা আমাকে উদ্ধার করে। সেই ভয়াবহ রাতের কথা আজও মনে পড়ে।’ সরেজমিনে দেখা গেছে, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে খালগোড়া গণকবর এখন অস্তিত্বহীন। ইতোমধ্যে ২-৩টি কবর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বাকিগুলোও রয়েছে অরক্ষিত অবস্থায়। সেখানে এখন অস্তিত্ব হিসেবে রয়েছে ‘রাঙ্গাবালী গণকবর হাফিজিয়া মাদ্রাসা এবং শিশু এতিমখানা ও লিল্লাহ বোডিং’। ২০১১ সালে এই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু হয়। তবে এখন সেখানে তেমন কার্যক্রম লক্ষ্য করা যায়নি।

 

স্থানীয়রা জানায়, সরকারি কিংবা বেসরকারি উদ্যোগ না নেওয়ায় ১৫ বছর অতিবাহিত হয়ে গেলেও গণকবর অরক্ষিত রয়েছে। তাছাড়া বর্তমান প্রজন্মের কাছে এ ঘটনা এখন অজানা। এ ব্যাপারে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘গণকবর দীর্ঘদিন ধরে অবহেলায় রয়েছে। ইতোমধ্যে এ বিষয়টি আমাদের দৃষ্টিতে এসেছে। জেলা পরিষদ এবং উপজেলা পরিষদের যৌথ উদ্যোগে ওই গণকবর রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি এটিকে উপজেলা গণকবরস্থানে উন্নিত করা হবে।’

সংবাদটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে শেয়ার করুন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



Click Here

সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



About Us | Privacy Policy | Terms & Conditions | Contact Us | Sitemap
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মো: আবুল কালাম আজাদ, খোকন
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক : কামাল হোসেন খান
সম্পাদক : এডভোকেট মো: ফেরদৌস খান
বার্তা সম্পাদক : মো: সো‌হেল অাহ‌ম্মেদ
সহ-সম্পাদক : নুরুজ্জামান কাফি
মফস্বল বিভাগ প্রধান: উত্তম কুমার হাওলাদার
যোগাযোগ: বাড়ী- ৫০৬/এ, রোড- ৩৫,
মহাখালী, ডি ও এইচ এস, ঢাকা- ১২০৬,
ফোন: +৮৮ ০১৭৩১ ৬০০ ১৯৯, ৯৮৯১৮২৫,
বার্তা এবং বিজ্ঞাপন : + ৮৮ ০১৬৭৪ ৬৩২ ৫০৯।
বিজ্ঞাপন এবং নিউজ : + ৮৮ ০১৭১৬ ৮৯২ ৯৭০।
News: editor.kuakatanews@gmail.com

© Copyright BY KuakataNews.Com

Design & Developed BY PopularITLimited